প্রাক কথন - অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 3)
অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব
দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 3)
জানকী
বল্লভো বিজয়তে || শ্রী সীতারামাভ্যাং নমঃ || শ্রী হনুমতে নমঃ
লেখনীতে: কিশোর দাস (শ্রী মহারাজ জির কৃপাপ্রাপ্ত শ্রী
রাম কিশোর ভট্টাচার্য)
নমস্কার ও জয় সিয়ারাম,
রামানন্দী সম্প্রদায়ের ভাস্কর, পরম পূজনীয় মহান সাধক এবং আমাদের পরম গুরুদেব অনন্ত শ্রী আচার্যপাদ শ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী
ত্যাগী মহারাজ-এর চরণে
কোটি কোটি দণ্ডবৎ প্রণাম।
যাঁদের পুণ্যময় জীবন, অলৌকিক কর্মসাধন এবং অমৃতময় উপদেশ আমাদের
আধ্যাত্মিক পথের আলোকবর্তিকা, সেই মহাপুরুষের দিব্য জীবনগাথা কোনো একটি লেখায় বা একবারে প্রকাশ করা
অসম্ভব। শ্রী মহারাজ জির অহৈতুকী কৃপা এবং আদেশে, তাঁর সেই আলোকোজ্জ্বল জীবন, সাধনকাল এবং কল্যাণময়ী শিক্ষাকে আমরা এই মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে (বিভিন্ন পর্বে) আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি।
"মহাপুরুষদের
জীবন কথা কেবল পড়ার জন্য নয়, তা নিজের জীবনে ধারণ করে পরমার্থ লাভের পথ প্রশস্ত করার জন্য।"
শ্রী মহারাজ জির পরম কৃপাধন্য শিষ্য শ্রী কিশোর দাস (শ্রী রাম কিশোর ভট্টাচার্য) মহাশয়ের লেখনীর মাধ্যমে গুরুদেবের জীবনের
অন্তহীন অমৃত-কথা পর্বানুসারে নিয়মিত পোস্ট করা হবে। আশা করি, শ্রী মহারাজ জির এই জীবন-প্রসঙ্গ আপনাদের সকলের
হৃদয়কে ভক্তি ও শান্তিতে ভরিয়ে তুলবে এবং আধ্যাত্মিক মার্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য
করবে।
গুরুদেবের চরণে প্রার্থনা জানিয়ে আসুন আমরা
সবাই মিলে এই পুণ্যময় কথামৃতের আস্বাদ গ্রহণ করি।
জয় শ্রীরাম। জয় গুরুদেব।
----------------------------
পৃষ্ঠা ১
প্রথম অধ্যায়
প্রাক কথন
সংসারের মূলে প্রচ্ছন্ন সত্যতত্ত্বের অন্বেষণই মানব মাত্রের পরম লক্ষ্য; লক্ষ্য প্রাপ্তির নানা সাধন
পাত্র ভেদে শাস্ত্রে বর্ণিত রহিয়াছে। তত্ত্বের সার্বভৌমত্ব মিমাংসা রুচিভেদে বহু
হইলেও পরতত্ত্ব একটি মাত্র। নাম রূপের ভেদ উপাসকের কল্যাণার্থ বর্ণিত হইয়াছে। যোঃ
দেবানাং নামধা এক এব” বলিয়া বেদও ইহার নির্বুক্তি করেন এবং পুরাণও ইহার সমর্থন
করেন। বহুর মধ্যে একের পরিজ্ঞান ভারতীয় সংস্কৃতির নিজ বৈশিষ্ট্য। তত্ত্বের তাৎপর্য
ব্যাখ্যা দ্বারা ইহাই সুস্পষ্ট রূপে জ্ঞাত হওয়া যায় যে বস্তুতঃ সকলেই এক—উহার
জ্ঞান এক। জ্ঞানের আধার-আকার-সাধনা, আরাধনা-ধ্যেয়-জ্ঞেয় আদির পদ্ধতি বহু কিন্তু
সকলেই একই স্থানে কেন্দ্রীভূত। এই সাধনা-উপাসনা বিধি সমূহের আবিষ্কারক, প্রতিপাদক, প্রচারক ও লোকানুগ্রহ
আকাঙ্খায় আপামর জনসাধারণকে বিদ্ধরক সৎপুরুষ একই যিনি পরম উপকারক, অজ্ঞান বিনাশক এবং জ্ঞানের
প্রকাশক বলিয়া সদ্গুরু বলিয়া কীর্ত্তিত হইয়া থাকেন। গুরু তত্ত্বই সর্বোৎকৃষ্ট
পরতত্ত্ব যাঁহার পরে আর দ্বিতীয় কোনও পরম তত্ত্ব নাই। কথিত হয় “নাস্তি তত্ত্বং
গুরোঃ পরম্”। এই পরতত্ত্ব লাভ করত উহার সম্যক্ জ্ঞান সাধকের ত্রিতাপ নাশক হইয়া
থাকে। চতুর্বিধ পরম-পুরুষার্থ ইঁহার চরণে শরণাগতির দ্বারাই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
অতএব গুরুই সাধ্য-উপাস্য ও উপজীব্য। বেদ, তন্ত্র, স্মৃতি স্তোত্র গ্রন্থ সমূহের ইনিই প্রতিপাদ্য।
সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, অন্তরীক্ষ-ভূমণ্ডল-বন-নদী-সরোবর-সাগর-পর্বত-দিগদিগন্ত সকলেই ইঁহার
স্তুতিগানে মুখর—সকলেই শ্রদ্ধাবনত—ভাব বিভোর-আত্মবিস্মৃত সমীপত এবং সকল প্রকার
সেবায় নিরত। ইঁহার আজ্ঞা ঈশ্বরও লঙ্ঘন করেন না; ইঁহার ইচ্ছাই ক্রিয়া; ইঁহার জ্ঞান অনন্ত এবং ইনিও
অনন্ত, অনির্বাচ্য। মানবের ইতিহাসেই তাঁহার যুগ যাত্রার বর্ণনা রহিয়াছে। আজ যখন
আমরা যুগ-যুগ-কাল-কালান্তর হইতে আগত আমাদের ইতিহাসের ঋজুবক্র অরণ্যপথের উপর এক
বিহঙ্গম দৃষ্টিপাত করি তখন মাত্র কয়েক সহস্র বর্ষ পর্যন্ত আমাদের নয়নগোচর হয়।
দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা হেতু অদূরদর্শিতা ও পথের অপরিচিত দীর্ঘতা এই উভয়েই আমাদের
বিস্মরণ করাইয়া দিতেছে; প্রাগ ঐতিহাসিক যুগের অন্ধকারে উহা বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। পরন্তু আমাদের এই
পরম্পরা হইতে আগত তীর্থযাত্রার শুভারম্ভ আজ হইতে লক্ষাধিক বর্ষ পূর্বেই হইয়াছে।
১
পৃষ্ঠা ২
আদিকাল হইতে আমরা যে সকল জনপদের অল্পাধিক ধ্বংসাবশেষ প্রাপ্ত হইয়া থাকি সেই
ধ্বংসাবশেষগুলি তাহাদের দিগন্ত বিশ্রুত বারত্তা আমাদিগকে শ্রবণ করাইতেছে। এই সকল
বারতা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাসিদ্ধান্তরূপে ঋষিগণ দ্বারা প্রেরিত বাণী যাহা মরণধর্মী
মানবকে অমরতা প্রদান করে—সঞ্জীবিত করে ও জ্যোতির্ম্ময় করিয়া তোলে—আশ্রম ও উৎসাহ, জাগৃতি ও জিজ্ঞাসা প্রদান
করে।
সৃষ্টির অবিরল বিমল প্রবাহে অনাদিকাল হইতে জীব ও জগৎ নিমজ্জিত হইয়া
রহিয়াছে। অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড ও উহার নিয়ন্তা লীলাময় প্রভু প্রচ্ছন্ন রূপে
সর্বত্র বিরাজমান।
এষ সর্বেষু ভূতেষু গূঢ়োহত্মা ন প্রকাশতে।
দৃশ্যতে ত্বগ্র্যয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মদর্শীতিঃ॥ (কঠোপনিষদ ৩/১২)
ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন এই ব্রহ্মাণ্ডে বিচরণশীল নিত্যশুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত
স্বভাব আচার্যগণের আদর্শ সিদ্ধান্তে আশ্রিত থাকিয়া এই পরতত্ত্বের রহস্য ব্যাখ্যায়
রত। এই পরতত্ত্ব সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান ও এই পরতত্ত্বে অবস্থানই শ্রীগুরুদেবের
মঙ্গলময় দয়াদ্র দান এবং আচার্য্য, শ্রীগুরু সন্ত ও ঋষিগণের চরিত, উপদেশাবলী, এবং তাঁহাদের প্রদত্ত পরম্পরা আগত মন্ত্র ও পথ
নির্দেশ সাধক, উপাসক ও মুমুক্ষুগণের এই পবিত্র পথের একমাত্র পাথেয়। স্থান কাল ও
প্রবৃত্তির ভেদ নিমিত্ত গুরু, সন্ত ও ঋষিগণ প্রভু প্রাপ্তির বিভিন্ন মার্গ নির্ধারণ করিয়াছেন: কিন্তু ঐ
সকল বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক মত ও পথের গম্য স্থান একটি মাত্র। ঐ সকল পথ কোনটি সরল, কোনটি কঠিন, কোনটি বক্র প্রতীয়মান হয়। যথা
:—
রুচীনাং বৈচিত্র্যাদ্ ঋজু কুটিল নানা পথ যুষাং।
নৃণামেকো গম্যঃ ত্বমসি পয়সা ভর্ণব ইব॥
সন্তমার্গের বিভিন্নতা, উপাসনা পদ্ধতির অনেকতা, উপাস্যদেবের পৃথকতা, বিভিন্ন নামরূপধারী সম্প্রদায়গুলির বিকাশ ও চরম উৎকর্ষের স্থিতিতে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, আগম আদির জ্ঞেয়ধ্যেয় একই। এই
নিমিত্ত বৈষ্ণবগণের চারি সম্প্রদায়—শ্রী, নিম্বার্ক (সনকাদি), (ব্রহ্ম) মধ্ব, বিষ্ণুস্বামী (রুদ্র) ও গৌণ
সম্প্রদায়—কবীর, নানক, দাদু, মুলুক দ্বারা প্রবর্তিত পথ একই সম্প্রদায় অন্তর্গত রস রহস্য, ভাব ভেদ হইতে প্রবর্তিত
বিভিন্ন মত যথা শ্রীযুক্ত (লোহিত বর্ণশ্রী) শ্বেত শ্রী (লক্ষ্মীী), বেদীয়ুক্ত ও চতুর্ভুজী, রসিক সম্প্রদায় ও গৌড়ীয়
(চৈতন্য) সাধক সম্প্রদায় তথা ইঁহাদের অনেক আচার্য দ্বারা প্রবর্তিত তিলক পাঠ, ইষ্টার্চন, নিষ্ঠাদি দ্বারা
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অনন্ত সন্ত সম্প্রদায় এই ভারতভূমির মহণীয় গরিমাময় উৎকৃষ্ট পরম্পরার
বাহক। ঘোর দুর্দান্ত নিরাশাময় বিকট পরিস্থিতিতে
২
পৃষ্ঠা ৩
জনমানসকে ধৈর্য সাহস ও শ্রী প্রদানকারী এই আচার্য-সন্ত সম্প্রদায় আমাদের
পূর্ববর্তী পুরুষগণের শ্রেষ্ঠ ধারক বাহক।
বস্তুতপক্ষে আমাদিগের আধ্যাত্মিক বিচার ধারা ও লোক সংগ্রহকারী দৃষ্টিকোণ
নিমিত্ত সন্তগণের অবদান অবিস্মরণীয়। আদিকাব্যের প্রবর্তিতা মহর্ষি বাল্মীকি হইতে
আধুনিক কালের মহর্ষি অরবিন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ প্রমুখ প্রসিদ্ধ পরাত্মজ্ঞ সমাজোদ্ধারক নিষ্নার্থ জন জাগৃতির
উদ্গাতা ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, ক্ষেত্রে, ভাষা, ধর্ম্ম, রীতি, নীতি, মত, পথ সম্প্রদায় সমূহের স্বনামধন্য পূতকর্মা।
মূর্নি মহর্ষিগণের হৃদয় সঙ্গীত, সদুপদেশ আজও সেই সকল স্থান ও স্থিতি বিশেষের প্রেরণাপুঞ্জ হইয়া রহিয়াছে।
উদাহরণ স্বরূপ রুইদাস, নারসি মেহতা, পেরুমল গৃহ, অথবা নন্দদাস, সুরদাস তুলসীদাস, কম্পন, সমর্থগুরু রামদাস, জগতগুরু শঙ্কর, রামানুজ, রামানন্দ, শ্রীজী, রামস্নেহজী, স্বামীনারায়ণ, প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই সকল উদারধর্ম্মা সমন্বয়বাদী ভেদভাব
বিরোধী শান্তপ্রিয় মহাত্মাগণ শুধুমাত্র প্রেরণাপ্রদ ছিলেন না, তাঁহারা স্বীয় জীবন ও আচরণ
দ্বারা জাতিপাতি, ছুত-অছুত প্রভৃতি কুপ্রথাগুলি যে প্রকারে অতি সহজে দূর করিয়াছিলেন সমগ্র
সমাজ ও দেশ শ্রদ্ধাবনত হইয়া উহাদের অনুসরণ করিতেছে এবং ইঁহাদের উদাত্ত আদর্শ
অনুসরণ করিয়া জীবন ধন্য মানা হইয়া থাকে।
আচার্য্য তথা গুরুর প্রতিষ্ঠা মানব কবে এবং কেমন করিয়া করিয়াছে, এই পুরাতন সৌভাগ্য সরণীর
অনুসরণ কি প্রকারের, এই ধারণা কে প্রদান করিয়াছিল, ইহার উৎস কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন অদ্যাপি
অব্যাকৃত। পরন্তু ইহার সমাধান নিমিত্ত আমাদিগকে আর্য ঋষিগণের বারতাগুলির প্রতি
দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। অতএব এই পবিত্র মার্গে প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে সম্প্রদায়, আচার্য্য, গুরু, সন্ত, ভক্তি, ভক্ত শব্দের অর্থ নিরূপনের
রহস্যক্রম নির্ণয় আবশ্যক।
সম্প্রদায়: শাস্ত্রে সম্প্রদায় সম্বন্ধে নিম্নলিখিত শ্লোক বর্ণিত রহিয়াছে
:—
সম্যক্ প্রকৃষ্টঃ দানং চ মন্ত্রাদেঃ শ্রুতি মূলকম্।
ইত্যর্থঃ সম্প্রদায়েতি শব্দস্যোক্তঃ মহর্ষিভিঃ॥
উপরোক্ত শাস্ত্র বচন অনুসারে যিনি বৈদিক মন্ত্রাদি বিধিপূর্বক সম্যকরূপে
প্রকর্ষ করিয়া দান করেন অর্থাৎ বিধিপূর্বক উপদেশ করেন তাঁহাকে মহর্ষিগণ সম্প্রদায়
বলিয়া থাকেন। শাস্ত্র অনুসারে স্বয়ং শ্রীভগবান বৈদিক মন্ত্রাদি উপদেশ করিয়াছেন এই
নিমিত্ত সম্প্রদায়ও অনাদি। কলিকালের করাল চক্রে পূর্বোক্ত সকল সম্প্রদায়গুলি লুপ্ত
প্রায় হইতে থাকিলে বৈদিক সিদ্ধান্ত সমূহ তমসাচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। যে প্রকার
শ্রীভগবান আপন চতুর্ব্যূহ স্বরূপ (বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ) দ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুব্যবস্থা
করিয়া থাকেন
৩
পৃষ্ঠা ৪
সেই প্রকার তিনি চতুঃ সম্প্রদায়াচার্য্যব্যুহ দ্বারা অধ্যাত্ম জগতের
সুরক্ষা করেন। সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদমন, ধর্ম্মসংস্থাপন পূর্বক অধর্ম্মের বিনাশ এবং লোক কল্যাণের নিমিত্ত শ্রীভগবান
অবতীর্ণ হন। সেই প্রকার আচার্য অবতারও অজ্ঞান নিবৃত্তি, এবং জ্ঞান বৈরাগ্য, ভক্তিযোগ বিধান পূর্বক বৈদিক
মন্ত্র ও সিদ্ধান্ত সমূহের প্রচার ও সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যগুলি সুদৃঢ় ভাবে পুনঃ
স্থাপিত করিয়া জীবকে পরম পদ প্রাপ্তির মার্গ চালিত করত লোক কল্যাণ করিয়া থাকেন।
শ্রীসম্প্রদায়ের শ্রীরামানুজাচার্য্য ও শ্রীরামানন্দাচার্য্য, রুদ্র সম্প্রদায়ের আচার্য্য
শ্রীবিষ্ণুস্বামী, সনকাদি সম্প্রদায়ের শ্রীনিম্বার্কাচার্য্য এবং ব্রহ্ম সম্প্রদায়ের
শ্রীমধ্বাচার্য্য সমর্থক ও সংস্থাপক। ইঁহারা ভক্তি মার্গের ধারক ও বাহক ছিলেন।
ঈশ্বরঅবতার শ্রীশঙ্করাচার্য্য কলিকাল সনাতন বৈদিক ধর্ম্ম মোহিত জ্ঞান মার্গের
আচার্যরূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
এই সকল অনাদি সম্প্রদায়গুলির এবং সম্প্রদায় প্রবর্তকাচার্য্যগণ সম্বন্ধে
তত্ত্বজ্ঞ ও মর্মজ্ঞ সন্তমহাত্মাগণের হৃদয়োদ্ঘোষ প্রাচীন গ্রন্থ সমূহে দৃষ্ট হয়।
যথা :—
আশয় রহ সম্প্রদায়কো, ভব সাগরকো পোত।
তাপে চড়ি উতরে কেতিকে, ভবজল নিধিকোপোত॥
কামধেনু শ্রুতি শাস্ত্র সব, সম্প্রদায় ধন চারি।
প্রেম ভক্তিপয় এক হৈ, মনমে লখি বিচারি॥
মনমে লখো বিচারি একতে একন কমতী।
চহু দিশি তে সোপান মধুর হরি পদ পর চড়তী॥
ইক সম সেবা সাধনা চরিত রূপ পদ নাম হৈ।
চারো নিত্য অনাদি যে সেবত পূর্ণ কাম হৈ।
জ্ঞান দিয়ো শঙ্কর আচার্য রামানুজ পরপাতি।
বিষ্ণুস্বামীনে সেবা পূজা নিম্বারক আসক্তি॥
সেবক সেব্য ভাব দর্শায়ো মধুকর কৈরব চন্দ।
রাম ভজন ঔর সাধুসেবা স্বামী রামানন্দ॥ (ভক্ত বল্লভা টীকা)
ঈশ্বরঅংশ অবতার মহি মর্যাদা মাঙড়ি অঘট।
কলিযুগ ধর্মপালক প্রগট আচার্য শঙ্কর সুভট॥ (ভঃ মাঃ ছপ্পয় ৪২)
আদৌ জগদাধারঃ শেষস্তদনু সুমিত্রানন্দন বেষঃ।
তদুপরি ধৃতহল মুষল বিশেষস্তদনুস্তরমভবদ্ গুরূরেষঃ॥
(যতিরাজ স্তোত্রম্)
৪
পৃষ্ঠা ৫
নিম্বাদিত্যায় দেবায় জগজ্জন্মাদিকারিণে।
সুদর্শনাবতারায় নমস্তে চক্ররূপিণে॥ (শ্রীনিম্বার্কস্তোত্রম্)
হর্ষানন্দস্য শিষ্যোঽহি রাঘবানন্দদেশিকঃ।
যস্য বৈ শিষ্যতাং রামানন্দ স্বয়ং হরিঃ॥ (শ্রীরাম মন্ত্ররাজ পরম্পরা)
আচার্য বিষ্ণুস্বামী ভগবান কৃষ্ণের অবতার এবং আচার্য মধ্ব পবনদেবের অবতার
বলিয়া বর্ণিত হইয়া থাকে। (সুদামাকুটি, বৃন্দাবনধাম শ্রীরামানন্দ পুস্তকালয় প্রকাশিত, ভক্তমাল দ্বিতীয় খণ্ড
দ্রষ্টব্য)
আচার্য :—আচার্য শব্দের বিশদ অর্থ জানিতে হইলে লিঙ্গ পুরাণের নিম্নোক্ত
শ্লোক বিচার প্রয়োজন, কারণ এই শ্লোক আচার্য্যের স্বরূপ ও মহিমা পর্যাপ্তভাবে উদ্ঘাটন করিয়াছে :
আচিনোতি হি শাস্ত্রাণি স্বাচারে স্থাপয়ত্যপি।
স্বয়মাচরতে যস্মাৎ তস্মাদাচার্য্যঈ রিতঃ॥
অর্থাৎ যিনি শাস্ত্র হইতে সুবিমল আচার কর্তব্য সমূহ চয়ন পূর্বক স্বয়ং জীবনে
ধারণ করেন, উহা স্বসম্প্রদায়ে প্রবর্তন করত সংস্থাপিত করেন তাঁহাকে শাস্ত্র আচার্য
পদবী দ্বারা ভূষিত করিয়া থাকেন। এই সকল আচার কর্তব্য সমূহ ক্রমবদ্ধ প্রণালীতে আমরা
আমাদের সংকীর্ণ বুদ্ধিবশত অধিককাল মস্তিস্কে ধারণ করিতে সমর্থ নহি। পরন্তু নবীনতর
জ্ঞান অর্জনের ক্ষুধা পিপাসা আমাদের মনে জাগ্রত হইতে থাকে। এই দুস্তর কার্য প্রভু
স্বয়ং দয়ালু হইয়া লোক রক্ষার নিমিত্ত আচার্য্য রূপে অবতীর্ণ হইয়া থাকেন। উপনিষদেও আচার্য্যকে দেব বলিয়া উক্ত
হইয়াছে। যথা “আচার্য দেবো ভব” (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। প্রভু সমাধি ভাষা প্রকরণে
বলিয়াছেন—“আচার্য্য মাং বিজানীয়াৎ”। অতএব আচার্য্য ও ঈশ্বর উভয়েরই একত্র সিদ্ধ হয়।
ইহা নির্দেশ দিয়া প্রভু যুগপত উপদেশ করিয়াছেন যে এই সংসারে আচার্য্যের সহায়তা বিনা
আমাকে কেহ জানিতে পারেনা। আচার্য্যই কৃপাল প্রভু যিনি শিষ্যকে সম্প্রদায় বিধি
অনুসারে দীক্ষিত করত সম্প্রদায় পরম্পরা প্রচলিত সাধন মার্গে চালিত করিয়া ঈশ্বরের
উপলব্ধি করাইয়া থাকেন, ভ্রান্ত প্রমাদ যুক্ত মানবকে সনাতম মার্গে পরিচালন দ্বারা তাহার মুক্তির পথ
প্রশস্ত করেন; আচার্যের সংকেত ও নির্দেশ হইতে সাধকের উপাস্যদেব লাভ হয় এবং সকল ধার্মিক
সম্প্রদায়ের মঠ, মন্দির, তীর্থ, ব্রত, পুণ্যপর্ব, সত্য, সংস্কার, দান, দয়াদাক্ষিণ্য, উপকার, সেবা, শমদম, উপরতি, তিতিক্ষা, অষ্টাঙ্গযোগ, সাংস্কৃতিক ধারা, পূজোপচারবিধি এবং নৈতিকতা প্রভৃতি এই আচার্যগণের অনুপম দান। এই সকলের
আবিষ্কার, প্রচলন এবং সুরক্ষার নিমিত্ত সকল প্রযত্ন আচার্যগণের দুরাবাধ্য সাধনার ফল
স্বরূপ।
৫
পৃষ্ঠা ৬
গুরু :—মঙ্গলময় বর্ণযুগল অতি ব্যাপক ও পবিত্র অর্থে শাস্ত্রে উল্লিখিত ও
প্রসিদ্ধ।
যথা—
গু শব্দস্যাৎ অন্ধকারঃ রু শব্দ তৎনিরোধকঃ ।
অন্ধকার নিরোধিত্বাদ্ গুরুরিত্যভিধীয়তে॥ (গুরুগীতা)
সর্বেষামেব লোকানাং যথা সূর্যঃ প্রকাশকঃ।
গুরু প্রকাশকঃ তদ্বচ্ছিষ্যাণাং বুদ্ধিদানতঃ॥ (পদ্মপুরাণ ভূমিখণ্ড)
অর্থাৎ যিনি শিষ্যকে অজ্ঞানান্ধকার হইতে জ্ঞানরূপ আলোকে লইয়া যান তিনি
গুরু। সূর্যের কিরণে যেরূপ অন্ধকার নাশ হয় সেই প্রকার যাহার উপদেশরূপ
সূর্যকিরণমালায় শিষ্যের মোহান্ধকার নাশ হয় তিনি গুরু। গুরু তথা আচার্য শিষ্যের
অন্তর লোককে প্রকাশিত করেন। “মহামোহতমপুঞ্জ জাসুবচন রবিকর নিকর” (রাম চরিত মানস)।
শাস্ত্র শ্রীগুরু মহারাজকে সাক্ষাৎ পরম ব্রহ্ম বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। যথা :—
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥ (গুরুগীতা)
আচার্য্য মাং বিজানীায়াতাবমন্যেত কর্হিচিৎ।
ন মর্ত্যবুদ্ধ্যাচসূয়েত সর্বদেব ময়ো গুরুঃ॥ (শ্রীমদ্ভাগবত ১১।১৭।২৭)
উপরোক্ত শ্লোকে ভগবান শ্রীমুখে বলিয়াছেন যে আচার্যকে আমার স্বরূপ জানিবে।
তাঁহাকে কখনও কোন প্রকারে অবমাননা করিবেনা ও তাঁহাতে মনুষ্য বুদ্ধি রাখিবেনা। গুরু
সর্বদেবময়। আচার্যগণেরও ইহাই উপদেশ। শাস্ত্রমতে আচার্য ও গুরু একই।
শাস্ত্রে জন্মের দুই প্রকার ভেদ গণনা করা হইয়াছে। যথা: “দ্বিজত্বং জন্মনা
চ”। প্রথমটি বিদ্যা দ্বারা এবং দ্বিতীয়টি জন্ম দ্বারা। সাংসারিক স্থিতিতে মানবের
সমগ্র পরিস্থিতি ও ভূমিকা জন্ম দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং পারলৌকিক-পরমার্থিক
স্থিতিতে গুরু প্রদত্ত বিদ্যা দ্বারা নিরূপিত হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত বিদ্যাদাতাও
পিতা বলিয়া শাস্ত্র নির্দেশ করিয়াছেন। লৌকিক বিদ্যা কেবল মাত্র ভরণপোষণ নিমিত্ত
শিক্ষা দেওয়া হয় পরন্তু অলৌকিক তথা ব্রহ্ম বিদ্যা মনুষ্যকে মুক্তির পথে লইয়া যায়।
ইহাই পরা বিদ্যা বলিয়া কথিত হয়। যথা “সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে।” “অথ পরা যযা তদক্ষরধিগম্যতে”
(নারদ ভক্তি সূত্র)। শ্রীগুরুভগবানই এই পরাবিদ্যা প্রদাতা যাহা মনুষ্যকে “পুনরপি
জননং পুনরপি মরণং” হইতে বিমুক্ত পূর্বক পরম পদ প্রদান করে। এই প্রকার পরা বিদ্যা
যিনি প্রদান করেন তিনিও “পর” এই নিমিত্ত তাঁহার লীলাও ‘পরা’ যাহা অহংবাদী আমরা
জানিতে সক্ষম নহি।
৬
পৃষ্ঠা ৭
এই পরা তথা ব্রহ্ম বিদ্যা লাভের নিমিত্ত শাস্ত্র আচার্যদেব তথা শ্রীগুরু
ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করিতে নির্দেশ করিয়াছেন যথা:
“তদ্বিজ্ঞানার্থং স
গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ সমিৎ পাণিঃ শ্রোত্রিয়ং
ব্রহ্মনিষ্ঠং (মুণ্ডক উপনিষদ্ ১।২।১২)।
তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয় উত্তমম্।
শাস্ত্রে পরে চ নিষ্ঠাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্॥ (শ্রীমদ্ভাগবত ১১।৩।২১)
তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্ব দর্শিনঃ॥ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪।৩৪)
অজ্ঞান নিবৃত্তির সকল প্রযত্ন গুরুচরণে শরণাগতি হইতে প্রারম্ভ হইয়া থাকে।
অজ্ঞানই অসৎ, অজ্ঞানই মৃত্যু। অতএব মৃত্যু হইতে জীবনের দিকে, অমৃতের দিকে—অসৎ হইতে সত্যের
দিকে লইয়া যাওয়াই গুরু শব্দের লক্ষ্যার্থ। গুরু দিব্য, গুরু অমৃতময় ও মঙ্গলময়। অতএব
তাঁহার লীলাও মঙ্গলময়। এই স্থলে শ্রীগুরু তথা শ্রীভগবানের চরণে শরণাগতির তাৎপর্য
জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। শ্রীনারদপঞ্চরাত্রে শরণাগতি ষড়বিধা বর্ণিত হইয়াছে; যথা—
আনুকূল্যস্য সংকল্পঃ প্রাতিকূল্যস্য বর্জনম্।
রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসো গোপ্তৃত্ববরণং তথা।
আত্ম নিক্ষেপ কার্পণ্যে ষড়বিধা শরণাগতিঃ॥
অর্থাৎ শ্রীগুরুর শরণ প্রাপ্তির নিমিত্ত যে সকল বাক্য ও কর্ম অনুকূল উহা
মনে প্রাণে গ্রহণের সংকল্প প্রথম। শ্রীগুরুর শরণের প্রতিকূল বাক্য ও কর্ম পরিত্যাগ
দ্বিতীয়। তৃতীয়, শ্রীগুরু নিশ্চয়ই রক্ষা করিবেন ইহাতে দৃঢ় বিশ্বাস। শ্রীগুরুদেব একমাত্র
রক্ষক এইরূপ দৃঢ় বিশ্বাসে কায়মনোবাক্যে তাঁহার চরণে আশ্রয় গ্রহণ চতুর্থ। শ্রীগুরু
ভগবানের চরণে কায়মনোবাক্যে আত্মসমৰ্পণ অর্থাৎ আত্মনিবেদন ইহাই পঞ্চম, এবং ষষ্ঠ, শ্রীগুরুদেব চরণে স্বীয় দীনতা
অর্থাৎ লঘুতা প্রকাশ।
শ্রীগুরুদেবের মহিমা সম্বন্ধে রামচরিত মানস বালকাণ্ডে নিম্নলিখিত দোহা, চৌপাই পরিদৃষ্ট হয় :—
বন্দউ গুরুপদ কঞ্জ কৃপাসিন্ধু নররূপ হরি।
মহামোহতমপুঞ্জ জাসু বচন রবিকর নিকর॥
বন্দউ গুরুপদ পদুম পরাগা। সুরুচি সুবাস সরস অনুরাগা॥
অমিয় মূরি ময় চুরণ চারু। সমন সকল ভবরুজ পরিবারু॥
সুকৃতি সঙ্ঘতন বিমল বিভূতি। মঞ্জুল মঙ্গল মোদ প্রসূতি॥
জন মন মঞ্জু মুকুর মল হরনী। কিয় তিলকু গুণগুণ বস করনী॥
৭
পৃষ্ঠা ৮
শ্রীগুরু পদ নখ মণি গণ জ্যোতি। সুমিরত দিব্য দৃষ্টি হিয় হোতি॥
দলন মোহতম সো সুপ্রকাসু। বড়ো ভাগ উর আবই জাসূ॥
উঘরহী বিমল বিলোচন হি কে। মিটহী দোষ দুখ ভবরজনীকে॥
সূঝহি রাম চরিত মণি মানিক। গুপুত প্রগট জহ জো হী খানিক॥
যথা সুঅঞ্জন অজি দৃগ সাধক সিদ্ধ সুজান।
কৌতুক দেখত সল বন ভূতল ভূরি নিধান॥
গুরু পদ রজ মৃদু মঞ্জুল অঞ্জন। নয়ন অমিয় দৃগ দোষ বিভঞ্জন॥ (রামচরিত মানস)
সন্তকবীরদাস শ্রীগুরু সম্বন্ধে অতি মর্মস্পর্শী বাক্য কহিয়াছেন :—
গুরুগোবিন্দ দোউ খড়ে, কাকে লাগো পায়।
বলিহারী গুরু, আপনে গোবিন্দ দিয়ো বাতায়॥
গুরু হৈ বড়ো গোবিন্দ তেঁ, মন মে দেখু বিচার।
হরি সুমিরে সোবার হৈ, গুরু সুমিরে সো পার॥
সদ্গুরুকি মহিমা অনন্ত, অনন্ত কিয়া উপকার।
সদ্ গুরু পছদিখায়া, অনন্ত দিখাবন হার॥
গোস্বামী তুলসীদাস বলিয়াছেন যে :—
সন্ত সঙ্গে, ঔর গুরু সঙ্গে ঔর সঙ্গে সিয়ারাম।
তুলসী জগমে জীব কই তীনতোর বিশ্রাম॥
উপরিউক্ত পদগুলিতে সন্ত তথা শ্রীগুরুদেবের মহিমা প্রকাশিত এবং শ্রীগুরুদেব
সদৃশ উপকারক আর অন্য কেহ নাই। এই সংসারে গুরুই শিষ্যের বিশ্রাম ভূমি। এই স্বার্থময়
জগতে গুরু প্রভু শ্রীরাঘবেন্দ্র সরকার সদৃশ অহৈতুক কৃপা বর্ষণকারী; তিনিই জগতে মনুষ্যের যথার্থ
আত্মীয়, বান্ধব অন্য কেহ নহে। গোস্বামী তুলসীদাস, ব্রহ্মা শিব সদৃশ ঐশ্বর্য শক্তি সম্পন্ন
মনুষ্যগণের সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে এই প্রকার ঐশ্বর্য শক্তি সম্পন্ন মানব যদি
শ্রীগুরুদেব কর্তৃক অনুগৃহীত না হয় সে এই অপার সংসার সাগর উত্তীর্ণ হইতে পারে না।
“তব কোহৈ বপুরা আন জো গুমান
করে।”
অতএব গুরুর রহস্য ও মহিমাময় স্বরূপ সকলের নিমিত্ত অনিবার্য ঘোষণা করিয়া
শাস্ত্র আমাদের কঠিন পথ সরল করিয়াছেন। এই নিমিত্ত আমরা ঋষিগণের নিকট কৃতজ্ঞ। সন্ত
তথা আচার্য সদ্গুরুর জীবন ও জীবনী স্বয়ংই রহস্যময়। উহাতে নাম রূপ লীলা। ধাম সকলই
বিলক্ষণ, অলৌকিক, অজ্ঞেয় ও রহস্যময়। যাঁহার প্রতি তাঁহার মহতী কৃপা হয় তিনিই এই রহস্যতত্ত্ব
অল্পাধিক রূপে জানিতে সক্ষম হইয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে আমাদের ইহাই
৮
পৃষ্ঠা ৯
একমাত্র স্মরণে রাখা আবশ্যক যে কায়মনোবাক্যে আচার্য তথা গুরুদেবের স্মরণ
গ্রহণ পূর্বক অনন্য মনে তাঁহার উপাসনা করা শিষ্যের একান্ত কর্তব্য। আচার্যদেবের
উপাসনার বিষয়ে শ্রীমদ্ভগবত গীতায় ত্রয়োদশ অধ্যায়, সপ্তম শ্লোকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র অর্জুনকে
উপদেশ করিয়াছেন। জ্ঞানেশ্বরী গ্রন্থে লোকগুরু শ্রীমৎ জ্ঞানদেব অতি মর্মস্পর্শী
ভাবে এই শ্লোকের আচার্য উপাসনা বিশদরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যথা :—
“এখন তোমাকে আচার্যোপাসনা
বলিতেছি। গুরুভক্তি সম্পূর্ণ ভাগ্যের জন্মভূমি। ইহা শোকগ্রস্ত মানুষকেও
রক্ষাস্বরূপ করিয়া দেয়। গুরুভক্তির সিদ্ধান্ত করিতেছি মনোযোগ করিয়া শ্রবণ কর।
গঙ্গা সম্পূর্ণ জলসম্পদ লইয়া সমুদ্রে মিলিত হয়, ব্রহ্ম পদে শ্রুতির গতি, প্রিয়া নিজের গুণগুণ প্রিয়
পতিকে সমর্পণ করে; সেইরূপ নিজের শরীর ও মন যে ব্যক্তি গুরুকুলে সমর্পিত করিয়া স্বয়ং ভক্তির
গৃহস্বরূপ হইয়া যায়; প্রিয়তম চিন্তায় বিরহিণীর মত যে গুরুদেবের বাসস্থানে মনটিকে ফেলিয়া রাখে, সেইদিক হইতে প্রবাহিত বায়ুকে
ছুটিয়া গিয়া যে প্রণাম করে এবং নিজের ঘরে ডাকিয়া আনে; যে প্রেমের বিহ্বলতায় গুরু
সম্বন্ধেই আলোচনা করিতে অভিলাষী,—আপন হৃদয়কে যে গুরুগৃহের সাক্ষীরূপে রাখে,—যে গলায় বাঁধা বাছুরীর মত উৎকণ্ঠিত ভাবে গুরু
আজ্ঞায় স্বগ্রামে বাস করিতে বাধ্য হয়,—সর্বদাই সেই বন্ধন ছিন্ন করিবার কথা মনে ভাবে,—কোনদিন প্রভুর দর্শন হইবে এই
ভাবনায় যাহার একটি পলকেও যুগের অধিক মনে করে,—গুরুদেবের গ্রাম হইতে কেহ আসিলে অথবা কেহ
প্রেরিত হইলে মৃত শরীরে প্রাণ সঞ্চারের মত যে পুলকিত হয়,—শুষ্ক অঙ্কুরে অমৃতধারার
মত—ক্ষুদ্র জলাশয়ের মৎস্য সমুদ্রে পতিত হওয়ার মত—দরিদ্রের ধন প্রাপ্তির মত,—অন্ধের চক্ষু পাওয়ার মত,—চির দুঃখীর ইন্দ্রপদ লাভের মত,—যে গুরুকুলের নাম শ্রবণে
অত্যন্ত আনন্দে পুলকিত,—সে আনন্দে আকাশকে আলিঙ্গন করিতে উৎসুক। এরূপ প্রেম যাহাতে দেখিবে, বুঝিবে জ্ঞান তাহার সেবা করে।
মনে মনে যে গুরুরূপের ধ্যান উপাসনা করে—শুদ্ধ হৃদয় মন্দিরে আরাধ্য গুরু
মূর্তিকে স্থির করিয়া ধনী হয়, সদ্ভাব সহিত যে নিজেই গুরুর পরিকর হয়,—চৈতন্য গৃহে আনন্দ মন্দিরে যে গুরুমূর্তি শিবের
উপর ধ্যানের পঞ্চামৃত বর্ষণ করে,—জ্ঞান সূর্যের উদয়ে যে বুদ্ধির ডালা হইতে সাত্বিক ভাবের লক্ষ পুষ্পাঞ্জলি
অর্পণ করে—শিবপূজার সন্ধিক্ষণে নিরন্তর যে জীবদশার ধূপপ্রজ্জ্বলিত করে—অথণ্ড
অদ্বৈত ভাবের নৈবেদ্য দান করে—নিজে পূজক হইয়া গুরুকে শিব ভাবনা করে—অথবা মনের
শয্যায় গুরুকে পতিরূপে সেবা করে—যাহার বুদ্ধি প্রেমের সন্তোষে পূর্ণ—যে অন্তরের
প্রেমকে ক্ষীর সমুদ্র মনে করিয়া গুরু ধ্যানের অনন্ত শয্যায় গুরুমূর্তি বিষ্ণুর
পদসেবাকারী লক্ষ্মীরূপ ধারণ করে—অথবা তাঁহার নাভি
৯
পৃষ্ঠা ১০
কমল জাত ব্রহ্মার রূপ ধারণ করে—গুরুমূর্তির এইরূপ বিচিত্র ধ্যানে আনন্দিত
হয়—কোনো সময় গুরুকে মাতা রূপে ভাবনা করিয়া স্বয়ং তাঁহার স্তন্যপায়ী শিশুর মত কোলে
লুটিয়া পড়ে—হে কিরীটী, চৈতন্য কল্পবৃক্ষের তলায় আবদ্ধ গোমাতার ন্যায় গুরুকে ভাবিয়া নিজে তাঁহার
বৎসরূপে ভাবনা করে—কখন গুরুরূপা ও স্নেহজলে বিহারশীল মীন স্বরূপে নিজেকে মনে
করে—কখন নিজে বৃক্ষ হইয়া গুরুপাককে অমৃতবৃষ্টি ভাবনা—যাহার মনের সংকল্প এরূপ—দেখ
কি অসীম প্রেম! কখন নিজে পক্ষ ও দৃষ্টিহীন ক্ষুদ্র পক্ষী শাবক, গুরুমাতা পক্ষী যে নিজ মুখে
আহার যোগায়; গুরুনৌকা যাহার সাহায্যে পারে যাওয়া যায়—প্রেমে একটির পর একটি ভাবনা হয়
পূর্ণ, সমুদ্রে একটির পর একটি তরঙ্গ উঠে, অধিক আর বলিব কি, গুরুমূর্তির সেবায় এরূপ আন্তরিক সুখ অনুভব হয়।
এখন গুরুদেবের বাহ্য সেবা বর্ণনা করিতেছি। গুরুদেব সন্তুষ্ট হইয়া বর দানের
ইচ্ছুক হইবেন, এরূপ উত্তম সেবার নিমিত্ত যে দৃঢ়-নিশ্চয় হয়—মনের মত সেবায় গুরুকে প্রসন্ন
করিয়া সে বিনয়ের সহিত বলে—প্রভো, আমি আপনার সকল কার্য্যের স্থান পূর্ণ করিব—আপনার পূজার সামগ্রী সকলই আমি
হইয়া যাইব। গুরুদেব অনুমোদন করিলে তাঁহার সকল আত্মীয় হইয়া থাকিব—পূজার দ্রব্য হইয়া
যাইব; তখন ভক্তির কৌতুক দেখা যাইবে।
গুরু অনেকের মাতা, আমি কৃপামৃত গুরুকে সেবায় সন্তুষ্ট করাইয়া শপথ করাইব, তিনি একা আমার হইয়া থাকিবেন।
তাঁহাকে প্রেমের মোহ লাগাইয়া দিব, এক পত্নীব্রত ধারী করাইব, প্রীতির লোভে অন্যস্থান সম্বন্ধে নিস্পৃহ করাইয়া আমার নিকট
ক্ষেত্রসন্ন্যাসী করাইব। গুরুকৃপা পিঞ্জরস্বরূপ আমার সমীপে তাঁহাকে বন্ধ করিয়া
রাখিব। বাহিরের বাতাস তাঁহার গায়ে লাগিতে দিব না। গুরুসেবারূপা প্রভু পত্নীকে নানা
গুণের অলঙ্কারে আবৃত করিব—আমি গুরুভক্তির উড্ডীন হইয়া যাইব—গুরুস্নেহ বর্ষণের
ক্ষেত্র হইয়া থাকিব। এরূপ মনোভাবী সহস্রসৃষ্টি শিষ্য রচনা করে। সে বলে আমি গুরুগৃহ
হইব, আমি সেবক হইয়া সেবা করিব, যাতায়াতের সময় যে দেউল লঙ্ঘন করিয়া যান আমি গুরুদেবের সেই দেউল হইব—তাঁহার
দ্বার এবং দ্বার-পাল হইব। আমি তাঁহার পাদুকা হইব এবং পাদুকা পায়ে পরাইয়া দিব। আমি
ছত্র ও ছত্রধারী হইব। আমি চোপদার হইয়া উঁচুনিচু স্থান দেখাইয়া সঙ্গে যাইব।
চামরধারী হইয়া হাত ধরিয়া লইয়া যাইব। আমি মশালধারী হইব—পিকদানী হইয়া তাহাতে আচমন
করাইব। স্নানের কার্য্যও আমি করাইব। গুরুদেবের আসন, অলঙ্কার, বস্ত্র, চন্দন ইত্যাদি সকল দ্রব্যই আমি হইয়া যাইব। আমি
পাচক হইয়া রন্ধন করিব, পরিবেশন করিব, আরতি করিব তাঁহাকে। গুরুদেবের ভোজনের পর ভোজন করিব। তাম্বুল দিব, তাঁহার উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার
করিব, শয্যা রচনা করিব। পদসেবা করিব। আমি
১০

Comments
Post a Comment