প্রাক কথন - অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 3)
অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব
দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 3)
জানকী
বল্লভো বিজয়তে || শ্রী সীতারামাভ্যাং নমঃ || শ্রী হনুমতে নমঃ
লেখনীতে: কিশোর দাস (শ্রী মহারাজ জির কৃপাপ্রাপ্ত শ্রী
রাম কিশোর ভট্টাচার্য)
নমস্কার ও জয় সিয়ারাম,
রামানন্দী সম্প্রদায়ের ভাস্কর, পরম পূজনীয় মহান সাধক এবং আমাদের পরম গুরুদেব অনন্ত শ্রী আচার্যপাদ শ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী
ত্যাগী মহারাজ-এর চরণে
কোটি কোটি দণ্ডবৎ প্রণাম।
যাঁদের পুণ্যময় জীবন, অলৌকিক কর্মসাধন এবং অমৃতময় উপদেশ আমাদের
আধ্যাত্মিক পথের আলোকবর্তিকা, সেই মহাপুরুষের দিব্য জীবনগাথা কোনো একটি লেখায় বা একবারে প্রকাশ করা
অসম্ভব। শ্রী মহারাজ জির অহৈতুকী কৃপা এবং আদেশে, তাঁর সেই আলোকোজ্জ্বল জীবন, সাধনকাল এবং কল্যাণময়ী শিক্ষাকে আমরা এই মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে (বিভিন্ন পর্বে) আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি।
"মহাপুরুষদের
জীবন কথা কেবল পড়ার জন্য নয়, তা নিজের জীবনে ধারণ করে পরমার্থ লাভের পথ প্রশস্ত করার জন্য।"
শ্রী মহারাজ জির পরম কৃপাধন্য শিষ্য শ্রী কিশোর দাস (শ্রী রাম কিশোর ভট্টাচার্য) মহাশয়ের লেখনীর মাধ্যমে গুরুদেবের জীবনের
অন্তহীন অমৃত-কথা পর্বানুসারে নিয়মিত পোস্ট করা হবে। আশা করি, শ্রী মহারাজ জির এই জীবন-প্রসঙ্গ আপনাদের সকলের
হৃদয়কে ভক্তি ও শান্তিতে ভরিয়ে তুলবে এবং আধ্যাত্মিক মার্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য
করবে।
গুরুদেবের চরণে প্রার্থনা জানিয়ে আসুন আমরা
সবাই মিলে এই পুণ্যময় কথামৃতের আস্বাদ গ্রহণ করি।
জয় শ্রীরাম। জয় গুরুদেব।
----------------------------
পৃষ্ঠা ১
প্রথম অধ্যায়
প্রাক কথন
সংসারের মূলে প্রচ্ছন্ন সত্যতত্ত্বের অন্বেষণই মানব মাত্রের পরম লক্ষ্য; লক্ষ্য প্রাপ্তির নানা সাধন
পাত্র ভেদে শাস্ত্রে বর্ণিত রহিয়াছে। তত্ত্বের সার্বভৌমত্ব মিমাংসা রুচিভেদে বহু
হইলেও পরতত্ত্ব একটি মাত্র। নাম রূপের ভেদ উপাসকের কল্যাণার্থ বর্ণিত হইয়াছে। যোঃ
দেবানাং নামধা এক এব” বলিয়া বেদও ইহার নির্বুক্তি করেন এবং পুরাণও ইহার সমর্থন
করেন। বহুর মধ্যে একের পরিজ্ঞান ভারতীয় সংস্কৃতির নিজ বৈশিষ্ট্য। তত্ত্বের তাৎপর্য
ব্যাখ্যা দ্বারা ইহাই সুস্পষ্ট রূপে জ্ঞাত হওয়া যায় যে বস্তুতঃ সকলেই এক—উহার
জ্ঞান এক। জ্ঞানের আধার-আকার-সাধনা, আরাধনা-ধ্যেয়-জ্ঞেয় আদির পদ্ধতি বহু কিন্তু
সকলেই একই স্থানে কেন্দ্রীভূত। এই সাধনা-উপাসনা বিধি সমূহের আবিষ্কারক, প্রতিপাদক, প্রচারক ও লোকানুগ্রহ
আকাঙ্খায় আপামর জনসাধারণকে বিদ্ধরক সৎপুরুষ একই যিনি পরম উপকারক, অজ্ঞান বিনাশক এবং জ্ঞানের
প্রকাশক বলিয়া সদ্গুরু বলিয়া কীর্ত্তিত হইয়া থাকেন। গুরু তত্ত্বই সর্বোৎকৃষ্ট
পরতত্ত্ব যাঁহার পরে আর দ্বিতীয় কোনও পরম তত্ত্ব নাই। কথিত হয় “নাস্তি তত্ত্বং
গুরোঃ পরম্”। এই পরতত্ত্ব লাভ করত উহার সম্যক্ জ্ঞান সাধকের ত্রিতাপ নাশক হইয়া
থাকে। চতুর্বিধ পরম-পুরুষার্থ ইঁহার চরণে শরণাগতির দ্বারাই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
অতএব গুরুই সাধ্য-উপাস্য ও উপজীব্য। বেদ, তন্ত্র, স্মৃতি স্তোত্র গ্রন্থ সমূহের ইনিই প্রতিপাদ্য।
সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, অন্তরীক্ষ-ভূমণ্ডল-বন-নদী-সরোবর-সাগর-পর্বত-দিগদিগন্ত সকলেই ইঁহার
স্তুতিগানে মুখর—সকলেই শ্রদ্ধাবনত—ভাব বিভোর-আত্মবিস্মৃত সমীপত এবং সকল প্রকার
সেবায় নিরত। ইঁহার আজ্ঞা ঈশ্বরও লঙ্ঘন করেন না; ইঁহার ইচ্ছাই ক্রিয়া; ইঁহার জ্ঞান অনন্ত এবং ইনিও
অনন্ত, অনির্বাচ্য। মানবের ইতিহাসেই তাঁহার যুগ যাত্রার বর্ণনা রহিয়াছে। আজ যখন
আমরা যুগ-যুগ-কাল-কালান্তর হইতে আগত আমাদের ইতিহাসের ঋজুবক্র অরণ্যপথের উপর এক
বিহঙ্গম দৃষ্টিপাত করি তখন মাত্র কয়েক সহস্র বর্ষ পর্যন্ত আমাদের নয়নগোচর হয়।
দৃষ্টিশক্তির ক্ষীণতা হেতু অদূরদর্শিতা ও পথের অপরিচিত দীর্ঘতা এই উভয়েই আমাদের
বিস্মরণ করাইয়া দিতেছে; প্রাগ ঐতিহাসিক যুগের অন্ধকারে উহা বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে। পরন্তু আমাদের এই
পরম্পরা হইতে আগত তীর্থযাত্রার শুভারম্ভ আজ হইতে লক্ষাধিক বর্ষ পূর্বেই হইয়াছে।
১
পৃষ্ঠা ২
আদিকাল হইতে আমরা যে সকল জনপদের অল্পাধিক ধ্বংসাবশেষ প্রাপ্ত হইয়া থাকি সেই
ধ্বংসাবশেষগুলি তাহাদের দিগন্ত বিশ্রুত বারত্তা আমাদিগকে শ্রবণ করাইতেছে। এই সকল
বারতা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাসিদ্ধান্তরূপে ঋষিগণ দ্বারা প্রেরিত বাণী যাহা মরণধর্মী
মানবকে অমরতা প্রদান করে—সঞ্জীবিত করে ও জ্যোতির্ম্ময় করিয়া তোলে—আশ্রম ও উৎসাহ, জাগৃতি ও জিজ্ঞাসা প্রদান
করে।
সৃষ্টির অবিরল বিমল প্রবাহে অনাদিকাল হইতে জীব ও জগৎ নিমজ্জিত হইয়া
রহিয়াছে। অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ড ও উহার নিয়ন্তা লীলাময় প্রভু প্রচ্ছন্ন রূপে
সর্বত্র বিরাজমান।
এষ সর্বেষু ভূতেষু গূঢ়োহত্মা ন প্রকাশতে।
দৃশ্যতে ত্বগ্র্যয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মদর্শীতিঃ॥ (কঠোপনিষদ ৩/১২)
ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন এই ব্রহ্মাণ্ডে বিচরণশীল নিত্যশুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত
স্বভাব আচার্যগণের আদর্শ সিদ্ধান্তে আশ্রিত থাকিয়া এই পরতত্ত্বের রহস্য ব্যাখ্যায়
রত। এই পরতত্ত্ব সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান ও এই পরতত্ত্বে অবস্থানই শ্রীগুরুদেবের
মঙ্গলময় দয়াদ্র দান এবং আচার্য্য, শ্রীগুরু সন্ত ও ঋষিগণের চরিত, উপদেশাবলী, এবং তাঁহাদের প্রদত্ত পরম্পরা আগত মন্ত্র ও পথ
নির্দেশ সাধক, উপাসক ও মুমুক্ষুগণের এই পবিত্র পথের একমাত্র পাথেয়। স্থান কাল ও
প্রবৃত্তির ভেদ নিমিত্ত গুরু, সন্ত ও ঋষিগণ প্রভু প্রাপ্তির বিভিন্ন মার্গ নির্ধারণ করিয়াছেন: কিন্তু ঐ
সকল বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক মত ও পথের গম্য স্থান একটি মাত্র। ঐ সকল পথ কোনটি সরল, কোনটি কঠিন, কোনটি বক্র প্রতীয়মান হয়। যথা
:—
রুচীনাং বৈচিত্র্যাদ্ ঋজু কুটিল নানা পথ যুষাং।
নৃণামেকো গম্যঃ ত্বমসি পয়সা ভর্ণব ইব॥
সন্তমার্গের বিভিন্নতা, উপাসনা পদ্ধতির অনেকতা, উপাস্যদেবের পৃথকতা, বিভিন্ন নামরূপধারী সম্প্রদায়গুলির বিকাশ ও চরম উৎকর্ষের স্থিতিতে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, আগম আদির জ্ঞেয়ধ্যেয় একই। এই
নিমিত্ত বৈষ্ণবগণের চারি সম্প্রদায়—শ্রী, নিম্বার্ক (সনকাদি), (ব্রহ্ম) মধ্ব, বিষ্ণুস্বামী (রুদ্র) ও গৌণ
সম্প্রদায়—কবীর, নানক, দাদু, মুলুক দ্বারা প্রবর্তিত পথ একই সম্প্রদায় অন্তর্গত রস রহস্য, ভাব ভেদ হইতে প্রবর্তিত
বিভিন্ন মত যথা শ্রীযুক্ত (লোহিত বর্ণশ্রী) শ্বেত শ্রী (লক্ষ্মীী), বেদীয়ুক্ত ও চতুর্ভুজী, রসিক সম্প্রদায় ও গৌড়ীয়
(চৈতন্য) সাধক সম্প্রদায় তথা ইঁহাদের অনেক আচার্য দ্বারা প্রবর্তিত তিলক পাঠ, ইষ্টার্চন, নিষ্ঠাদি দ্বারা
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অনন্ত সন্ত সম্প্রদায় এই ভারতভূমির মহণীয় গরিমাময় উৎকৃষ্ট পরম্পরার
বাহক। ঘোর দুর্দান্ত নিরাশাময় বিকট পরিস্থিতিতে
২
পৃষ্ঠা ৩
জনমানসকে ধৈর্য সাহস ও শ্রী প্রদানকারী এই আচার্য-সন্ত সম্প্রদায় আমাদের
পূর্ববর্তী পুরুষগণের শ্রেষ্ঠ ধারক বাহক।
বস্তুতপক্ষে আমাদিগের আধ্যাত্মিক বিচার ধারা ও লোক সংগ্রহকারী দৃষ্টিকোণ
নিমিত্ত সন্তগণের অবদান অবিস্মরণীয়। আদিকাব্যের প্রবর্তিতা মহর্ষি বাল্মীকি হইতে
আধুনিক কালের মহর্ষি অরবিন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, বিবেকানন্দ প্রমুখ প্রসিদ্ধ পরাত্মজ্ঞ সমাজোদ্ধারক নিষ্নার্থ জন জাগৃতির
উদ্গাতা ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, ক্ষেত্রে, ভাষা, ধর্ম্ম, রীতি, নীতি, মত, পথ সম্প্রদায় সমূহের স্বনামধন্য পূতকর্মা।
মূর্নি মহর্ষিগণের হৃদয় সঙ্গীত, সদুপদেশ আজও সেই সকল স্থান ও স্থিতি বিশেষের প্রেরণাপুঞ্জ হইয়া রহিয়াছে।
উদাহরণ স্বরূপ রুইদাস, নারসি মেহতা, পেরুমল গৃহ, অথবা নন্দদাস, সুরদাস তুলসীদাস, কম্পন, সমর্থগুরু রামদাস, জগতগুরু শঙ্কর, রামানুজ, রামানন্দ, শ্রীজী, রামস্নেহজী, স্বামীনারায়ণ, প্রভৃতির নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। এই সকল উদারধর্ম্মা সমন্বয়বাদী ভেদভাব
বিরোধী শান্তপ্রিয় মহাত্মাগণ শুধুমাত্র প্রেরণাপ্রদ ছিলেন না, তাঁহারা স্বীয় জীবন ও আচরণ
দ্বারা জাতিপাতি, ছুত-অছুত প্রভৃতি কুপ্রথাগুলি যে প্রকারে অতি সহজে দূর করিয়াছিলেন সমগ্র
সমাজ ও দেশ শ্রদ্ধাবনত হইয়া উহাদের অনুসরণ করিতেছে এবং ইঁহাদের উদাত্ত আদর্শ
অনুসরণ করিয়া জীবন ধন্য মানা হইয়া থাকে।
আচার্য্য তথা গুরুর প্রতিষ্ঠা মানব কবে এবং কেমন করিয়া করিয়াছে, এই পুরাতন সৌভাগ্য সরণীর
অনুসরণ কি প্রকারের, এই ধারণা কে প্রদান করিয়াছিল, ইহার উৎস কোথায় ইত্যাদি প্রশ্ন অদ্যাপি
অব্যাকৃত। পরন্তু ইহার সমাধান নিমিত্ত আমাদিগকে আর্য ঋষিগণের বারতাগুলির প্রতি
দৃষ্টিপাত করিতে হইবে। অতএব এই পবিত্র মার্গে প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে সম্প্রদায়, আচার্য্য, গুরু, সন্ত, ভক্তি, ভক্ত শব্দের অর্থ নিরূপনের
রহস্যক্রম নির্ণয় আবশ্যক।
সম্প্রদায়: শাস্ত্রে সম্প্রদায় সম্বন্ধে নিম্নলিখিত শ্লোক বর্ণিত রহিয়াছে
:—
সম্যক্ প্রকৃষ্টঃ দানং চ মন্ত্রাদেঃ শ্রুতি মূলকম্।
ইত্যর্থঃ সম্প্রদায়েতি শব্দস্যোক্তঃ মহর্ষিভিঃ॥
উপরোক্ত শাস্ত্র বচন অনুসারে যিনি বৈদিক মন্ত্রাদি বিধিপূর্বক সম্যকরূপে
প্রকর্ষ করিয়া দান করেন অর্থাৎ বিধিপূর্বক উপদেশ করেন তাঁহাকে মহর্ষিগণ সম্প্রদায়
বলিয়া থাকেন। শাস্ত্র অনুসারে স্বয়ং শ্রীভগবান বৈদিক মন্ত্রাদি উপদেশ করিয়াছেন এই
নিমিত্ত সম্প্রদায়ও অনাদি। কলিকালের করাল চক্রে পূর্বোক্ত সকল সম্প্রদায়গুলি লুপ্ত
প্রায় হইতে থাকিলে বৈদিক সিদ্ধান্ত সমূহ তমসাচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। যে প্রকার
শ্রীভগবান আপন চতুর্ব্যূহ স্বরূপ (বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ) দ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুব্যবস্থা
করিয়া থাকেন
৩
পৃষ্ঠা ৪
সেই প্রকার তিনি চতুঃ সম্প্রদায়াচার্য্যব্যুহ দ্বারা অধ্যাত্ম জগতের
সুরক্ষা করেন। সাধুগণের পরিত্রাণ, দুষ্টদমন, ধর্ম্মসংস্থাপন পূর্বক অধর্ম্মের বিনাশ এবং লোক কল্যাণের নিমিত্ত শ্রীভগবান
অবতীর্ণ হন। সেই প্রকার আচার্য অবতারও অজ্ঞান নিবৃত্তি, এবং জ্ঞান বৈরাগ্য, ভক্তিযোগ বিধান পূর্বক বৈদিক
মন্ত্র ও সিদ্ধান্ত সমূহের প্রচার ও সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যগুলি সুদৃঢ় ভাবে পুনঃ
স্থাপিত করিয়া জীবকে পরম পদ প্রাপ্তির মার্গ চালিত করত লোক কল্যাণ করিয়া থাকেন।
শ্রীসম্প্রদায়ের শ্রীরামানুজাচার্য্য ও শ্রীরামানন্দাচার্য্য, রুদ্র সম্প্রদায়ের আচার্য্য
শ্রীবিষ্ণুস্বামী, সনকাদি সম্প্রদায়ের শ্রীনিম্বার্কাচার্য্য এবং ব্রহ্ম সম্প্রদায়ের
শ্রীমধ্বাচার্য্য সমর্থক ও সংস্থাপক। ইঁহারা ভক্তি মার্গের ধারক ও বাহক ছিলেন।
ঈশ্বরঅবতার শ্রীশঙ্করাচার্য্য কলিকাল সনাতন বৈদিক ধর্ম্ম মোহিত জ্ঞান মার্গের
আচার্যরূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।
এই সকল অনাদি সম্প্রদায়গুলির এবং সম্প্রদায় প্রবর্তকাচার্য্যগণ সম্বন্ধে
তত্ত্বজ্ঞ ও মর্মজ্ঞ সন্তমহাত্মাগণের হৃদয়োদ্ঘোষ প্রাচীন গ্রন্থ সমূহে দৃষ্ট হয়।
যথা :—
আশয় রহ সম্প্রদায়কো, ভব সাগরকো পোত।
তাপে চড়ি উতরে কেতিকে, ভবজল নিধিকোপোত॥
কামধেনু শ্রুতি শাস্ত্র সব, সম্প্রদায় ধন চারি।
প্রেম ভক্তিপয় এক হৈ, মনমে লখি বিচারি॥
মনমে লখো বিচারি একতে একন কমতী।
চহু দিশি তে সোপান মধুর হরি পদ পর চড়তী॥
ইক সম সেবা সাধনা চরিত রূপ পদ নাম হৈ।
চারো নিত্য অনাদি যে সেবত পূর্ণ কাম হৈ।
জ্ঞান দিয়ো শঙ্কর আচার্য রামানুজ পরপাতি।
বিষ্ণুস্বামীনে সেবা পূজা নিম্বারক আসক্তি॥
সেবক সেব্য ভাব দর্শায়ো মধুকর কৈরব চন্দ।
রাম ভজন ঔর সাধুসেবা স্বামী রামানন্দ॥ (ভক্ত বল্লভা টীকা)
ঈশ্বরঅংশ অবতার মহি মর্যাদা মাঙড়ি অঘট।
কলিযুগ ধর্মপালক প্রগট আচার্য শঙ্কর সুভট॥ (ভঃ মাঃ ছপ্পয় ৪২)
আদৌ জগদাধারঃ শেষস্তদনু সুমিত্রানন্দন বেষঃ।
তদুপরি ধৃতহল মুষল বিশেষস্তদনুস্তরমভবদ্ গুরূরেষঃ॥
(যতিরাজ স্তোত্রম্)
৪
পৃষ্ঠা ৫
নিম্বাদিত্যায় দেবায় জগজ্জন্মাদিকারিণে।
সুদর্শনাবতারায় নমস্তে চক্ররূপিণে॥ (শ্রীনিম্বার্কস্তোত্রম্)
হর্ষানন্দস্য শিষ্যোঽহি রাঘবানন্দদেশিকঃ।
যস্য বৈ শিষ্যতাং রামানন্দ স্বয়ং হরিঃ॥ (শ্রীরাম মন্ত্ররাজ পরম্পরা)
আচার্য বিষ্ণুস্বামী ভগবান কৃষ্ণের অবতার এবং আচার্য মধ্ব পবনদেবের অবতার
বলিয়া বর্ণিত হইয়া থাকে। (সুদামাকুটি, বৃন্দাবনধাম শ্রীরামানন্দ পুস্তকালয় প্রকাশিত, ভক্তমাল দ্বিতীয় খণ্ড
দ্রষ্টব্য)
আচার্য :—আচার্য শব্দের বিশদ অর্থ জানিতে হইলে লিঙ্গ পুরাণের নিম্নোক্ত
শ্লোক বিচার প্রয়োজন, কারণ এই শ্লোক আচার্য্যের স্বরূপ ও মহিমা পর্যাপ্তভাবে উদ্ঘাটন করিয়াছে :
আচিনোতি হি শাস্ত্রাণি স্বাচারে স্থাপয়ত্যপি।
স্বয়মাচরতে যস্মাৎ তস্মাদাচার্য্যঈ রিতঃ॥
অর্থাৎ যিনি শাস্ত্র হইতে সুবিমল আচার কর্তব্য সমূহ চয়ন পূর্বক স্বয়ং জীবনে
ধারণ করেন, উহা স্বসম্প্রদায়ে প্রবর্তন করত সংস্থাপিত করেন তাঁহাকে শাস্ত্র আচার্য
পদবী দ্বারা ভূষিত করিয়া থাকেন। এই সকল আচার কর্তব্য সমূহ ক্রমবদ্ধ প্রণালীতে আমরা
আমাদের সংকীর্ণ বুদ্ধিবশত অধিককাল মস্তিস্কে ধারণ করিতে সমর্থ নহি। পরন্তু নবীনতর
জ্ঞান অর্জনের ক্ষুধা পিপাসা আমাদের মনে জাগ্রত হইতে থাকে। এই দুস্তর কার্য প্রভু
স্বয়ং দয়ালু হইয়া লোক রক্ষার নিমিত্ত আচার্য্য রূপে অবতীর্ণ হইয়া থাকেন। উপনিষদেও আচার্য্যকে দেব বলিয়া উক্ত
হইয়াছে। যথা “আচার্য দেবো ভব” (তৈত্তিরীয় উপনিষদ)। প্রভু সমাধি ভাষা প্রকরণে
বলিয়াছেন—“আচার্য্য মাং বিজানীয়াৎ”। অতএব আচার্য্য ও ঈশ্বর উভয়েরই একত্র সিদ্ধ হয়।
ইহা নির্দেশ দিয়া প্রভু যুগপত উপদেশ করিয়াছেন যে এই সংসারে আচার্য্যের সহায়তা বিনা
আমাকে কেহ জানিতে পারেনা। আচার্য্যই কৃপাল প্রভু যিনি শিষ্যকে সম্প্রদায় বিধি
অনুসারে দীক্ষিত করত সম্প্রদায় পরম্পরা প্রচলিত সাধন মার্গে চালিত করিয়া ঈশ্বরের
উপলব্ধি করাইয়া থাকেন, ভ্রান্ত প্রমাদ যুক্ত মানবকে সনাতম মার্গে পরিচালন দ্বারা তাহার মুক্তির পথ
প্রশস্ত করেন; আচার্যের সংকেত ও নির্দেশ হইতে সাধকের উপাস্যদেব লাভ হয় এবং সকল ধার্মিক
সম্প্রদায়ের মঠ, মন্দির, তীর্থ, ব্রত, পুণ্যপর্ব, সত্য, সংস্কার, দান, দয়াদাক্ষিণ্য, উপকার, সেবা, শমদম, উপরতি, তিতিক্ষা, অষ্টাঙ্গযোগ, সাংস্কৃতিক ধারা, পূজোপচারবিধি এবং নৈতিকতা প্রভৃতি এই আচার্যগণের অনুপম দান। এই সকলের
আবিষ্কার, প্রচলন এবং সুরক্ষার নিমিত্ত সকল প্রযত্ন আচার্যগণের দুরাবাধ্য সাধনার ফল
স্বরূপ।
৫
পৃষ্ঠা ৬
গুরু :—মঙ্গলময় বর্ণযুগল অতি ব্যাপক ও পবিত্র অর্থে শাস্ত্রে উল্লিখিত ও
প্রসিদ্ধ।
যথা—
গু শব্দস্যাৎ অন্ধকারঃ রু শব্দ তৎনিরোধকঃ ।
অন্ধকার নিরোধিত্বাদ্ গুরুরিত্যভিধীয়তে॥ (গুরুগীতা)
সর্বেষামেব লোকানাং যথা সূর্যঃ প্রকাশকঃ।
গুরু প্রকাশকঃ তদ্বচ্ছিষ্যাণাং বুদ্ধিদানতঃ॥ (পদ্মপুরাণ ভূমিখণ্ড)
অর্থাৎ যিনি শিষ্যকে অজ্ঞানান্ধকার হইতে জ্ঞানরূপ আলোকে লইয়া যান তিনি
গুরু। সূর্যের কিরণে যেরূপ অন্ধকার নাশ হয় সেই প্রকার যাহার উপদেশরূপ
সূর্যকিরণমালায় শিষ্যের মোহান্ধকার নাশ হয় তিনি গুরু। গুরু তথা আচার্য শিষ্যের
অন্তর লোককে প্রকাশিত করেন। “মহামোহতমপুঞ্জ জাসুবচন রবিকর নিকর” (রাম চরিত মানস)।
শাস্ত্র শ্রীগুরু মহারাজকে সাক্ষাৎ পরম ব্রহ্ম বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। যথা :—
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুঃ সাক্ষাৎ পরব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥ (গুরুগীতা)
আচার্য্য মাং বিজানীায়াতাবমন্যেত কর্হিচিৎ।
ন মর্ত্যবুদ্ধ্যাচসূয়েত সর্বদেব ময়ো গুরুঃ॥ (শ্রীমদ্ভাগবত ১১।১৭।২৭)
উপরোক্ত শ্লোকে ভগবান শ্রীমুখে বলিয়াছেন যে আচার্যকে আমার স্বরূপ জানিবে।
তাঁহাকে কখনও কোন প্রকারে অবমাননা করিবেনা ও তাঁহাতে মনুষ্য বুদ্ধি রাখিবেনা। গুরু
সর্বদেবময়। আচার্যগণেরও ইহাই উপদেশ। শাস্ত্রমতে আচার্য ও গুরু একই।
শাস্ত্রে জন্মের দুই প্রকার ভেদ গণনা করা হইয়াছে। যথা: “দ্বিজত্বং জন্মনা
চ”। প্রথমটি বিদ্যা দ্বারা এবং দ্বিতীয়টি জন্ম দ্বারা। সাংসারিক স্থিতিতে মানবের
সমগ্র পরিস্থিতি ও ভূমিকা জন্ম দ্বারা নির্ধারিত হয় এবং পারলৌকিক-পরমার্থিক
স্থিতিতে গুরু প্রদত্ত বিদ্যা দ্বারা নিরূপিত হইয়া থাকে। এই নিমিত্ত বিদ্যাদাতাও
পিতা বলিয়া শাস্ত্র নির্দেশ করিয়াছেন। লৌকিক বিদ্যা কেবল মাত্র ভরণপোষণ নিমিত্ত
শিক্ষা দেওয়া হয় পরন্তু অলৌকিক তথা ব্রহ্ম বিদ্যা মনুষ্যকে মুক্তির পথে লইয়া যায়।
ইহাই পরা বিদ্যা বলিয়া কথিত হয়। যথা “সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে।” “অথ পরা যযা তদক্ষরধিগম্যতে”
(নারদ ভক্তি সূত্র)। শ্রীগুরুভগবানই এই পরাবিদ্যা প্রদাতা যাহা মনুষ্যকে “পুনরপি
জননং পুনরপি মরণং” হইতে বিমুক্ত পূর্বক পরম পদ প্রদান করে। এই প্রকার পরা বিদ্যা
যিনি প্রদান করেন তিনিও “পর” এই নিমিত্ত তাঁহার লীলাও ‘পরা’ যাহা অহংবাদী আমরা
জানিতে সক্ষম নহি।
৬
পৃষ্ঠা ৭
এই পরা তথা ব্রহ্ম বিদ্যা লাভের নিমিত্ত শাস্ত্র আচার্যদেব তথা শ্রীগুরু
ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করিতে নির্দেশ করিয়াছেন যথা:
“তদ্বিজ্ঞানার্থং স
গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ সমিৎ পাণিঃ শ্রোত্রিয়ং
ব্রহ্মনিষ্ঠং (মুণ্ডক উপনিষদ্ ১।২।১২)।
তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয় উত্তমম্।
শাস্ত্রে পরে চ নিষ্ঠাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্॥ (শ্রীমদ্ভাগবত ১১।৩।২১)
তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্ব দর্শিনঃ॥ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪।৩৪)
অজ্ঞান নিবৃত্তির সকল প্রযত্ন গুরুচরণে শরণাগতি হইতে প্রারম্ভ হইয়া থাকে।
অজ্ঞানই অসৎ, অজ্ঞানই মৃত্যু। অতএব মৃত্যু হইতে জীবনের দিকে, অমৃতের দিকে—অসৎ হইতে সত্যের
দিকে লইয়া যাওয়াই গুরু শব্দের লক্ষ্যার্থ। গুরু দিব্য, গুরু অমৃতময় ও মঙ্গলময়। অতএব
তাঁহার লীলাও মঙ্গলময়। এই স্থলে শ্রীগুরু তথা শ্রীভগবানের চরণে শরণাগতির তাৎপর্য
জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। শ্রীনারদপঞ্চরাত্রে শরণাগতি ষড়বিধা বর্ণিত হইয়াছে; যথা—
আনুকূল্যস্য সংকল্পঃ প্রাতিকূল্যস্য বর্জনম্।
রক্ষিষ্যতীতি বিশ্বাসো গোপ্তৃত্ববরণং তথা।
আত্ম নিক্ষেপ কার্পণ্যে ষড়বিধা শরণাগতিঃ॥
অর্থাৎ শ্রীগুরুর শরণ প্রাপ্তির নিমিত্ত যে সকল বাক্য ও কর্ম অনুকূল উহা
মনে প্রাণে গ্রহণের সংকল্প প্রথম। শ্রীগুরুর শরণের প্রতিকূল বাক্য ও কর্ম পরিত্যাগ
দ্বিতীয়। তৃতীয়, শ্রীগুরু নিশ্চয়ই রক্ষা করিবেন ইহাতে দৃঢ় বিশ্বাস। শ্রীগুরুদেব একমাত্র
রক্ষক এইরূপ দৃঢ় বিশ্বাসে কায়মনোবাক্যে তাঁহার চরণে আশ্রয় গ্রহণ চতুর্থ। শ্রীগুরু
ভগবানের চরণে কায়মনোবাক্যে আত্মসমৰ্পণ অর্থাৎ আত্মনিবেদন ইহাই পঞ্চম, এবং ষষ্ঠ, শ্রীগুরুদেব চরণে স্বীয় দীনতা
অর্থাৎ লঘুতা প্রকাশ।
শ্রীগুরুদেবের মহিমা সম্বন্ধে রামচরিত মানস বালকাণ্ডে নিম্নলিখিত দোহা, চৌপাই পরিদৃষ্ট হয় :—
বন্দউ গুরুপদ কঞ্জ কৃপাসিন্ধু নররূপ হরি।
মহামোহতমপুঞ্জ জাসু বচন রবিকর নিকর॥
বন্দউ গুরুপদ পদুম পরাগা। সুরুচি সুবাস সরস অনুরাগা॥
অমিয় মূরি ময় চুরণ চারু। সমন সকল ভবরুজ পরিবারু॥
সুকৃতি সঙ্ঘতন বিমল বিভূতি। মঞ্জুল মঙ্গল মোদ প্রসূতি॥
জন মন মঞ্জু মুকুর মল হরনী। কিয় তিলকু গুণগুণ বস করনী॥
৭
পৃষ্ঠা ৮
শ্রীগুরু পদ নখ মণি গণ জ্যোতি। সুমিরত দিব্য দৃষ্টি হিয় হোতি॥
দলন মোহতম সো সুপ্রকাসু। বড়ো ভাগ উর আবই জাসূ॥
উঘরহী বিমল বিলোচন হি কে। মিটহী দোষ দুখ ভবরজনীকে॥
সূঝহি রাম চরিত মণি মানিক। গুপুত প্রগট জহ জো হী খানিক॥
যথা সুঅঞ্জন অজি দৃগ সাধক সিদ্ধ সুজান।
কৌতুক দেখত সল বন ভূতল ভূরি নিধান॥
গুরু পদ রজ মৃদু মঞ্জুল অঞ্জন। নয়ন অমিয় দৃগ দোষ বিভঞ্জন॥ (রামচরিত মানস)
সন্তকবীরদাস শ্রীগুরু সম্বন্ধে অতি মর্মস্পর্শী বাক্য কহিয়াছেন :—
গুরুগোবিন্দ দোউ খড়ে, কাকে লাগো পায়।
বলিহারী গুরু, আপনে গোবিন্দ দিয়ো বাতায়॥
গুরু হৈ বড়ো গোবিন্দ তেঁ, মন মে দেখু বিচার।
হরি সুমিরে সোবার হৈ, গুরু সুমিরে সো পার॥
সদ্গুরুকি মহিমা অনন্ত, অনন্ত কিয়া উপকার।
সদ্ গুরু পছদিখায়া, অনন্ত দিখাবন হার॥
গোস্বামী তুলসীদাস বলিয়াছেন যে :—
সন্ত সঙ্গে, ঔর গুরু সঙ্গে ঔর সঙ্গে সিয়ারাম।
তুলসী জগমে জীব কই তীনতোর বিশ্রাম॥
উপরিউক্ত পদগুলিতে সন্ত তথা শ্রীগুরুদেবের মহিমা প্রকাশিত এবং শ্রীগুরুদেব
সদৃশ উপকারক আর অন্য কেহ নাই। এই সংসারে গুরুই শিষ্যের বিশ্রাম ভূমি। এই স্বার্থময়
জগতে গুরু প্রভু শ্রীরাঘবেন্দ্র সরকার সদৃশ অহৈতুক কৃপা বর্ষণকারী; তিনিই জগতে মনুষ্যের যথার্থ
আত্মীয়, বান্ধব অন্য কেহ নহে। গোস্বামী তুলসীদাস, ব্রহ্মা শিব সদৃশ ঐশ্বর্য শক্তি সম্পন্ন
মনুষ্যগণের সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে এই প্রকার ঐশ্বর্য শক্তি সম্পন্ন মানব যদি
শ্রীগুরুদেব কর্তৃক অনুগৃহীত না হয় সে এই অপার সংসার সাগর উত্তীর্ণ হইতে পারে না।
“তব কোহৈ বপুরা আন জো গুমান
করে।”
অতএব গুরুর রহস্য ও মহিমাময় স্বরূপ সকলের নিমিত্ত অনিবার্য ঘোষণা করিয়া
শাস্ত্র আমাদের কঠিন পথ সরল করিয়াছেন। এই নিমিত্ত আমরা ঋষিগণের নিকট কৃতজ্ঞ। সন্ত
তথা আচার্য সদ্গুরুর জীবন ও জীবনী স্বয়ংই রহস্যময়। উহাতে নাম রূপ লীলা। ধাম সকলই
বিলক্ষণ, অলৌকিক, অজ্ঞেয় ও রহস্যময়। যাঁহার প্রতি তাঁহার মহতী কৃপা হয় তিনিই এই রহস্যতত্ত্ব
অল্পাধিক রূপে জানিতে সক্ষম হইয়া থাকেন। এই প্রসঙ্গে আমাদের ইহাই
৮
পৃষ্ঠা ৯
একমাত্র স্মরণে রাখা আবশ্যক যে কায়মনোবাক্যে আচার্য তথা গুরুদেবের স্মরণ
গ্রহণ পূর্বক অনন্য মনে তাঁহার উপাসনা করা শিষ্যের একান্ত কর্তব্য। আচার্যদেবের
উপাসনার বিষয়ে শ্রীমদ্ভগবত গীতায় ত্রয়োদশ অধ্যায়, সপ্তম শ্লোকে ভগবান শ্রী কৃষ্ণচন্দ্র অর্জুনকে
উপদেশ করিয়াছেন। জ্ঞানেশ্বরী গ্রন্থে লোকগুরু শ্রীমৎ জ্ঞানদেব অতি মর্মস্পর্শী
ভাবে এই শ্লোকের আচার্য উপাসনা বিশদরূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যথা :—
“এখন তোমাকে আচার্যোপাসনা
বলিতেছি। গুরুভক্তি সম্পূর্ণ ভাগ্যের জন্মভূমি। ইহা শোকগ্রস্ত মানুষকেও
রক্ষাস্বরূপ করিয়া দেয়। গুরুভক্তির সিদ্ধান্ত করিতেছি মনোযোগ করিয়া শ্রবণ কর।
গঙ্গা সম্পূর্ণ জলসম্পদ লইয়া সমুদ্রে মিলিত হয়, ব্রহ্ম পদে শ্রুতির গতি, প্রিয়া নিজের গুণগুণ প্রিয়
পতিকে সমর্পণ করে; সেইরূপ নিজের শরীর ও মন যে ব্যক্তি গুরুকুলে সমর্পিত করিয়া স্বয়ং ভক্তির
গৃহস্বরূপ হইয়া যায়; প্রিয়তম চিন্তায় বিরহিণীর মত যে গুরুদেবের বাসস্থানে মনটিকে ফেলিয়া রাখে, সেইদিক হইতে প্রবাহিত বায়ুকে
ছুটিয়া গিয়া যে প্রণাম করে এবং নিজের ঘরে ডাকিয়া আনে; যে প্রেমের বিহ্বলতায় গুরু
সম্বন্ধেই আলোচনা করিতে অভিলাষী,—আপন হৃদয়কে যে গুরুগৃহের সাক্ষীরূপে রাখে,—যে গলায় বাঁধা বাছুরীর মত উৎকণ্ঠিত ভাবে গুরু
আজ্ঞায় স্বগ্রামে বাস করিতে বাধ্য হয়,—সর্বদাই সেই বন্ধন ছিন্ন করিবার কথা মনে ভাবে,—কোনদিন প্রভুর দর্শন হইবে এই
ভাবনায় যাহার একটি পলকেও যুগের অধিক মনে করে,—গুরুদেবের গ্রাম হইতে কেহ আসিলে অথবা কেহ
প্রেরিত হইলে মৃত শরীরে প্রাণ সঞ্চারের মত যে পুলকিত হয়,—শুষ্ক অঙ্কুরে অমৃতধারার
মত—ক্ষুদ্র জলাশয়ের মৎস্য সমুদ্রে পতিত হওয়ার মত—দরিদ্রের ধন প্রাপ্তির মত,—অন্ধের চক্ষু পাওয়ার মত,—চির দুঃখীর ইন্দ্রপদ লাভের মত,—যে গুরুকুলের নাম শ্রবণে
অত্যন্ত আনন্দে পুলকিত,—সে আনন্দে আকাশকে আলিঙ্গন করিতে উৎসুক। এরূপ প্রেম যাহাতে দেখিবে, বুঝিবে জ্ঞান তাহার সেবা করে।
মনে মনে যে গুরুরূপের ধ্যান উপাসনা করে—শুদ্ধ হৃদয় মন্দিরে আরাধ্য গুরু
মূর্তিকে স্থির করিয়া ধনী হয়, সদ্ভাব সহিত যে নিজেই গুরুর পরিকর হয়,—চৈতন্য গৃহে আনন্দ মন্দিরে যে গুরুমূর্তি শিবের
উপর ধ্যানের পঞ্চামৃত বর্ষণ করে,—জ্ঞান সূর্যের উদয়ে যে বুদ্ধির ডালা হইতে সাত্বিক ভাবের লক্ষ পুষ্পাঞ্জলি
অর্পণ করে—শিবপূজার সন্ধিক্ষণে নিরন্তর যে জীবদশার ধূপপ্রজ্জ্বলিত করে—অথণ্ড
অদ্বৈত ভাবের নৈবেদ্য দান করে—নিজে পূজক হইয়া গুরুকে শিব ভাবনা করে—অথবা মনের
শয্যায় গুরুকে পতিরূপে সেবা করে—যাহার বুদ্ধি প্রেমের সন্তোষে পূর্ণ—যে অন্তরের
প্রেমকে ক্ষীর সমুদ্র মনে করিয়া গুরু ধ্যানের অনন্ত শয্যায় গুরুমূর্তি বিষ্ণুর
পদসেবাকারী লক্ষ্মীরূপ ধারণ করে—অথবা তাঁহার নাভি
৯
পৃষ্ঠা ১০
কমল জাত ব্রহ্মার রূপ ধারণ করে—গুরুমূর্তির এইরূপ বিচিত্র ধ্যানে আনন্দিত
হয়—কোনো সময় গুরুকে মাতা রূপে ভাবনা করিয়া স্বয়ং তাঁহার স্তন্যপায়ী শিশুর মত কোলে
লুটিয়া পড়ে—হে কিরীটী, চৈতন্য কল্পবৃক্ষের তলায় আবদ্ধ গোমাতার ন্যায় গুরুকে ভাবিয়া নিজে তাঁহার
বৎসরূপে ভাবনা করে—কখন গুরুরূপা ও স্নেহজলে বিহারশীল মীন স্বরূপে নিজেকে মনে
করে—কখন নিজে বৃক্ষ হইয়া গুরুপাককে অমৃতবৃষ্টি ভাবনা—যাহার মনের সংকল্প এরূপ—দেখ
কি অসীম প্রেম! কখন নিজে পক্ষ ও দৃষ্টিহীন ক্ষুদ্র পক্ষী শাবক, গুরুমাতা পক্ষী যে নিজ মুখে
আহার যোগায়; গুরুনৌকা যাহার সাহায্যে পারে যাওয়া যায়—প্রেমে একটির পর একটি ভাবনা হয়
পূর্ণ, সমুদ্রে একটির পর একটি তরঙ্গ উঠে, অধিক আর বলিব কি, গুরুমূর্তির সেবায় এরূপ আন্তরিক সুখ অনুভব হয়।
এখন গুরুদেবের বাহ্য সেবা বর্ণনা করিতেছি। গুরুদেব সন্তুষ্ট হইয়া বর দানের
ইচ্ছুক হইবেন, এরূপ উত্তম সেবার নিমিত্ত যে দৃঢ়-নিশ্চয় হয়—মনের মত সেবায় গুরুকে প্রসন্ন
করিয়া সে বিনয়ের সহিত বলে—প্রভো, আমি আপনার সকল কার্য্যের স্থান পূর্ণ করিব—আপনার পূজার সামগ্রী সকলই আমি
হইয়া যাইব। গুরুদেব অনুমোদন করিলে তাঁহার সকল আত্মীয় হইয়া থাকিব—পূজার দ্রব্য হইয়া
যাইব; তখন ভক্তির কৌতুক দেখা যাইবে।
গুরু অনেকের মাতা, আমি কৃপামৃত গুরুকে সেবায় সন্তুষ্ট করাইয়া শপথ করাইব, তিনি একা আমার হইয়া থাকিবেন।
তাঁহাকে প্রেমের মোহ লাগাইয়া দিব, এক পত্নীব্রত ধারী করাইব, প্রীতির লোভে অন্যস্থান সম্বন্ধে নিস্পৃহ করাইয়া আমার নিকট
ক্ষেত্রসন্ন্যাসী করাইব। গুরুকৃপা পিঞ্জরস্বরূপ আমার সমীপে তাঁহাকে বন্ধ করিয়া
রাখিব। বাহিরের বাতাস তাঁহার গায়ে লাগিতে দিব না। গুরুসেবারূপা প্রভু পত্নীকে নানা
গুণের অলঙ্কারে আবৃত করিব—আমি গুরুভক্তির উড্ডীন হইয়া যাইব—গুরুস্নেহ বর্ষণের
ক্ষেত্র হইয়া থাকিব। এরূপ মনোভাবী সহস্রসৃষ্টি শিষ্য রচনা করে। সে বলে আমি গুরুগৃহ
হইব, আমি সেবক হইয়া সেবা করিব, যাতায়াতের সময় যে দেউল লঙ্ঘন করিয়া যান আমি গুরুদেবের সেই দেউল হইব—তাঁহার
দ্বার এবং দ্বার-পাল হইব। আমি তাঁহার পাদুকা হইব এবং পাদুকা পায়ে পরাইয়া দিব। আমি
ছত্র ও ছত্রধারী হইব। আমি চোপদার হইয়া উঁচুনিচু স্থান দেখাইয়া সঙ্গে যাইব।
চামরধারী হইয়া হাত ধরিয়া লইয়া যাইব। আমি মশালধারী হইব—পিকদানী হইয়া তাহাতে আচমন
করাইব। স্নানের কার্য্যও আমি করাইব। গুরুদেবের আসন, অলঙ্কার, বস্ত্র, চন্দন ইত্যাদি সকল দ্রব্যই আমি হইয়া যাইব। আমি
পাচক হইয়া রন্ধন করিব, পরিবেশন করিব, আরতি করিব তাঁহাকে। গুরুদেবের ভোজনের পর ভোজন করিব। তাম্বুল দিব, তাঁহার উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার
করিব, শয্যা রচনা করিব। পদসেবা করিব। আমি
১০
Page 11
নিজেই সিংহাসন হইয়া তাহাতে গুরুদেবকে বসাইয়া সেবার পূর্ণতা অনুভব করিব। শ্রীগুরুদেবের যে বস্তু চমৎকৃতি উৎপাদন করে, আমি তাহাই হইয়া যাইব। তাঁহার শ্রবণ যুদ্ধে আমি অক্ষৌহিণী সেনা হইয়া হরি কথাই তাঁহাকে শুনাইব। তিনি যে বস্তু স্পর্শে আনন্দিত আমি উহার রূপ ধারণ করিব। রসনার বৃত্তিজনক রস ও তাঁহার জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সুখদায়ক গন্ধ হইয়া আমি সেবা করিব। আমি তাঁহার বাহ্য ও অন্তর সর্বপ্রকার সেবা দ্রব্য হইব। যতদিন দেহ আছে আমি এইভাবে সেবা করিয়া আমার মৃত্যুর পরেও সেবার নিমিত্ত মনোবৃত্তি রক্ষা করিব।
শ্রীগুরুর চরণস্পৃষ্ট ভূমিতে আমার দেহাবশেষ মৃত্তিকার অংশ, তাঁহার স্পর্শ সুখদায়ক জলে জলীয় অংশ, তাঁহার আরতির দীপশিখার তেজ অংশ, তাঁহার চামর বা পাখার বাতাসে প্রাণবায়ুর অংশ দিয়া সেবা করিব। তিনি যে অবকাশে অবস্থান করেন, উহাতে আমার আকাশের অংশ মিলাইয়া দিব। এইভাবে জীবন মরণ কোনো অবস্থায় গুরুসেবা ছাড়িব না। ক্ষণকালের নিমিত্ত অপরকে সেবার অবসর না দিয়া কোটি কল্প আমিই সেবা করিব। যিনি এই ভাবে গুরু সেবায় অতুলনীয় মানসিক ধৈর্য্য ধারণ করেন, দিবস রজনী—অল্প বা অধিক বিচার না করিয়া গুরু আজ্ঞাবলে হৃষ্টপুষ্ট থাকেন, সেই ব্যক্তি আকাশ হইতেও মহান হইয়া একাই সর্বকার্য্য সমাধান করেন। মনোবৃত্তির পূর্বেই তার দেহ সেবার নিমিত্ত ছুটিয়া গিয়া মনের সহিত বড়াই করিয়া কর্ত্তব্য সাধন করে।
কোনো সময়ে সে গুরুলীলার নিমিত্ত নিজের জীবনকে অবলীলাক্রমে দান করে। এইভাবে গুরুসেবায় যে কৃশ হইয়াছে—গুরুপ্রেমে পুষ্ট হইয়াছে—যে গুরু-আজ্ঞার নিবাসস্থান—যে গুরুকুলের গৌরবে গৌরবান্বিত—গুরু সম্বদ্ধি বান্ধবের সৌজন্যে সুজন—অনবরত গুরুবিলাসে বিলাসী—গুরুসম্প্রদায়ের ধর্ম্মই যাহার বর্ণাশ্রম—গুরু পরিচর্য্যা নিত্যকর্ম্ম—গুরুই ক্ষেত্রধাম, গুরুই দেবতা, গুরুই পিতামাতা, গুরুসেবা ভিন্ন যে অপর কিছু জানে না সেই জ্ঞানী। গুরুদ্বার যাহার সর্বস্ব, গুরুসেবক সহোদর সদৃশ, যাহার মুখে গুরুনাম মন্ত্রজপ, গুরুবাক্য ভিন্ন শাস্ত্র অস্পৃশ্য, গুরু চরণস্পৃষ্ঠ যে কোনো জল তীর্থ সলিল, গুরুর উচ্ছিষ্ট সমাধির অমৃতানুভব, যে ব্যক্তি গুরু গমনের সময় পশ্চাতে উত্থিত পদরেণু স্পর্শে কৈবল্যের আনন্দ অনুভব করে, হে কিরীটি সেই ব্যক্তি জ্ঞানী।
গুরুভক্তি অপার। যাহার গুরু সেবার এরূপ ইচ্ছা এবং প্রেম, যাহার ইহা ভিন্ন আর মধুরতর কিছুই নাই তাহাকেই তত্ত্বজ্ঞানী বুঝিবে। জ্ঞানের শোভা গুরুভক্তের সেবায়। জ্ঞান তাহার সেবক, গুরুভক্ত জ্ঞানের উপাস্য দেবতা। গুরু ভক্তের সমীপে জ্ঞানের মুক্ত দ্বার। এই গুরু সেবার জন্য আমার মন অভিলাষী সেই জন্য ব্যাখার সরল পথ ছাড়িয়া এই পথে ভ্রমণ করিলাম। আমার হস্ত
১১
Page 12
অবশ, ভজন বিষয়ে আমি অন্ধ, সেবা সম্বন্ধে পঙ্গু হইতেও মন্দ গতি, গুরু বর্ণনে মৌনী, আলস্য পরায়ণ, বৃথা পূর্ণ দেহ ধারণ করিতেছি—আমার মন প্রেম পূর্ণ। জ্ঞানদেব বলে এই নিমিত্ত আমার দেহ পোষণ আবশ্যক হইতেছে।”
সন্তঃ আচার্য্য ও সদগুরু একার্থ বোধক। সেই প্রকার সন্ত ও সদগুরু একই অর্থবোধক। যথা “সন্ত সবৈ গুরুদেব হৈ, গুরু হৈ সাঁচৈ সন্ত”। সাংসারিক স্থিতিতে সন্ত কিরূপ ভাবে অবস্থান করেন, তাঁহার স্বভাব কি প্রকার এবং সন্তের মহিমাই বা কি তাহা জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক। গোস্বামী তুলসীদাস বৈরাগ্য সন্দীপনী গ্রন্থে এই সকল বিষয় অতি বিশদ ভাবে বর্ণনা করিয়াছেন। উহা নিম্নরূপঃ
“অথ সন্ত স্বভাব বর্ণনম্ ॥
দোহা ঃ সরল বরণ ভাষা সরল, সরল অর্থময় মানি।
তুলসী সরলে সন্তজন তাহিপরী পহিচানি ॥
চৌপাই ঃ অতি শীতল অতিহী সুখদাই ।
শমদম রামভজন অধিকাই ॥
জড়জীবনকেঁ করে সচেতা ।
জগমাহী বিচরুত রহি হেতা ॥
দোহা ঃ তুলসী এসে কহু কহুঁ ধনি ধরণী বহু সন্ত ।
পরকাজে পরমারথী প্রীতি লিয়ে নিবহন্ত ॥
কী মুখ পট দীহৈ রহৈ, যথা অর্থভাষত।
তুলসী যা সংসারমে সো বিচরয়ুত সন্ত ॥
বোলৈ বচন বিচারিকৈ, লীহেঁ সন্ত সুভাব।
তুলসী দুখ দুৰ্বচনকেঁ, পছু দেত নহি পাব ॥
শত্রু ন কাহু করি গণৈ, মিত্র গণৈ নহি কাহি।
তুলসী রাহ মত সন্তকী বোলৈ সমতা মাহি ॥
চৌপাই ঃ অতি অনন্য গতি ইন্দ্রজীতা ।
জাকোঁ হরি বিনু কতহুঁ-ন চীতা ॥
মৃগতৃষ্ণা সম জগ জিয় জানি।
তুলসী তাহি সন্ত পহিচানি ॥
দোহা ঃ এক ভরোসো এক বল এক আস বিশ্বাস।
রামরূপ স্বাতীজলদ চাতক তুলসী দাস ॥
সো জন জগত জাহাজ হৈ জাকে রাগ ন দোষ।
তুলসী তৃষ্ণা ত্যাগিকৈ গহেউ শীল সন্তোষ ॥
১২
Page 13
শীল গহীন সবকী সহানি কহানি হোয় মুখ রাম
তুলসী রহিয়ে র্রাহি রহানি সন্ত জননকো কাম ॥
নিজ সঙ্গী নিজ সম করত, দুর্জন মন দুখ দূন।
মলয়া চল হৈ সন্ত জন তুলসী দোষ বিহীন ॥
কোমল বাণী সন্তকী, শ্রবৈ অমৃতময় আয়।
তুলসী তাহি কঠোর মন, সুনত মৌন হোই জায় ॥
অনুভব সুখ উৎপাত্ত করত, ভব শ্রম ধরি উঠায়।
ঐইসী বাণী সন্তকী, জো উর ভেঁদে আয় ॥
শীতল বাণী সন্তকী, শশীহুতে অনুমান।
তুলসী কোটি তপানি হরৈ, জো কেউ ধারে কান ॥
চৌপাই ঃ পাপ তাপ সব শূল নশাবৈ ।
মোহ অঘ রবি বচন বহাবৈ ॥
তুলসী এইসে সদগুরু সাধু ॥
বেদ মধ্য গুণ বিদিত অগাধু ॥
দোহা ঃ তন করি মন করি বচন করি, কাহু দূষত নাহি।
তুলসী এইসে সন্ত জন, রামরূপ জগমাহি ॥
মুখ দেখত পাতক হরৈ, পরসত কর্ম বিলাহিঁ।
বচন শুনত মন মোহগত, পূরব ভাগ মিলাহিঁ ॥
অতি কোমল অদু বিমল রুচি, মানসমে মলনাহিঁ।
তুলসী রত মন হোই র্রহে, অপনে সাহিবমাহিঁ ॥
জাকে মনতে উঠি गई, তিল তিল তৃষ্ণা চাহি।
মনসা বাচা কর্মনা তুলসী বন্দত তাহি ॥
কাঞ্চন কাচহি সম-গণৈ, কামিন কাষ্ঠ পাষাণ।
তুলসী এইসে সন্তজন, পৃথিবী ব্রহ্ম সমান ॥
চৌপাঈ ঃ কাঞ্চনকো মৃত্তিকা করি মানত ।
কামিনি কাষ্ঠশীলা পহিচানত ॥
তুলসী ভূলি গয়ো রস এহা ।
তে জন প্রগট রামকী দেহা ॥
দোহা ঃ অকিঞ্চন ইন্দ্রিয় দমন, রমন রাম ইকতার।
তুলসী এইসে সন্তজন বিরলে র্রা সংসার ॥
অহংবাদ মৈ তৈ নহি, দুষ্ট সঙ্গ নহি কোই।
দুখতে দুখ নহি উপজৈ, সুখতে সুখ নহি হোই ॥
১৩
Page 14
সম কাঞ্চন কাচে গণত, শত্রু মিত্র সম দোই।
তুলসী র্রা সংসারমে কহত সন্তজন সোই ॥
বিরলে বিরলে পাইয়ে মায়া ত্যাগী সন্ত।
তুলসী কামী কুটিল কলি কেকী কাক অনন্ত ॥
মৈ তৈ মেট্যো মোহতম, জগো আত্মা ভানু।
সন্তরাজ সো জানিয়ে, তুলসী র্রা সহিদানু ॥”
এই প্রকার সন্ত সংসারে অতি বিরল। ইহা শ্রীমদ্ভাগবতের নিম্নোক্ত শ্লোক হইতে সুস্পষ্টঃ
মুক্তানামপি সিদ্ধানাং নারায়ণ পরায়ণঃ।
সুদুর্লভঃ প্রশান্তাত্মা কোটিষ্বপি মহামুনে ॥
অর্থাৎ হে মহামুনে! কোটি জীবন্মুক্ত পরম সিদ্ধ গণের মধ্যেও পরম -শান্তচিত্ত নারায়ণ পরায়ণ ভক্ত অতি দুর্লভ। অন্যত্র এইরূপ কথিত হইয়াছে। যথা ঃ
গিরৌ গিরৌ ন মানিক্যং মৌক্তিকং ন গজে গজে।
সাধবো নহি সর্বত্র চন্দনং ন বনে বনে ॥
এই প্রকার হরিভক্ত সন্তের আগমনের নিমিত্ত সকল তীর্থ সর্বদা অতি ব্যাকুল ভাবে প্রতীক্ষা করেন। যথা ঃ
বালপন তে হরি ভজে জগতে র্রহে উদাস।
তীর্থ আশা করত হৈ কব আবৈ হরিদাস ॥
সম্পূর্ণ সংসার যে তীর্থ দর্শনের লালসা করিয়া থাকে সেই তীর্থ শ্রীহরির দাসের দর্শন অভিলাষ সদাসর্বদা কি নিমিত্ত করিয়া থাকেন? ইহার একমাত্র উত্তর ইহাই যে তীর্থ স্বীয় পরোপকারী স্বভাব বশতঃ সমাগত মনুষ্যের পাপরাশি স্বয়ং গ্রহণ করিয়া তাহাদিগকে সর্ব পাপ হইতে মুক্ত করেন। কিন্তু এই পাপরাশির ভারে ভারাক্রান্ত হইয়া তীর্থ হরিভক্ত সন্তের আগমন প্রতীক্ষায় থাকেন এবং ব্যাকুলভাবে চিন্তা করেন কখন সন্ত চরণ রজ দ্বারা আমাকে পবিত্র করিবেন। তীর্থকে সন্ত পবিত্র করেন এই প্রকার প্রসঙ্গ ভগীরথ গঙ্গা সংবাদে প্রাপ্ত হওয়া যায়। যথা শ্রীমদ্ভাগবতে ঃ
গঙ্গা উবাচ ঃ-কিং চাহং ন ভুবং যাসোন্নরা মধ্যমৃজন্ত্যঘম্।
সৃজামি তদ্বঘং কুত্র রাজংস্তত্র বিচিন্ত্যতাম্ ॥ (৯।৯।৫)
গঙ্গা বলিলেন—হে ভগীরথ, মনুষ্য আমাতে পাপ প্রক্ষালন করিবে এই নিমিত্ত আমি মর্তলোকে যাইব না। কারণ পাপভারাক্রান্ত হইলে আমি কি প্রকারে পাপ প্রক্ষালন করিব? এই বিষয়ে স্বয়ং বিচার পূর্বক বল।
ভগীরথ উবাচ ঃ-সাধবো ন্যাসিন ঃ শান্তা ব্রহ্মিষ্ঠা লোক পাবনাঃ।
হরন্ত্যঘং তেঽঙ্গসঙ্গাত্তেষাস্তে হ্যঘভিদ্ধরিঃ ॥ (৯।৯।৬)
১৪
Page 15
ভগীরথ বলিলেন—জননী, যাহারা লোক পরলোক, ধন সম্পত্তি ও পুত্র-কলত্রের বাসনাকে চিরতরে পরিত্যাগ অর্থাৎ সন্ন্যাস করিয়াছেন, যাহারা সংসারে অবস্থান করিয়াও নির্দন্দ্ব তথা শান্ত, যাহারা ব্রহ্মনিষ্ঠ ও সকল লোক পবিত্রকারী, এই প্রকার পরোপকারী সন্ত স্বীয় অঙ্গ স্পর্শ দ্বারা আপনার পাপরাশি বিধৌত করিবেন ; কারণ সন্তের হৃদয়ে অঘরূপ অঘাসুর সংহারকারী ভগবান নিবাস করেন।
হরিভক্ত পরায়ণ সন্ত প্রভুর অতি প্রিয় জন। শ্রীমদ্ভগবত গীতায় দ্বাদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জ্জুনকে ইহা স্বয়ং বর্ণনা করিয়াছেন। যথা ঃ—
অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ সমদুঃখ সুখঃ ক্ষমী ॥ (১২।১৩)
“সে চৈতন্য স্বরূপের ন্যায় প্রাণীমাত্রে রাগ বা দ্বেষ পোষণ করে না, আপন পর ভেদ-ভাব রাখে না। উত্তমকে স্থান দিব এবং অধমকে ত্যাগ করিব, পৃথিবী এ কথা কখনও চিন্তা করে না। সাধকও পৃথিবীর ব্যবহার অনুসরণ করে। কৃপালু প্রাণ-শক্তি কখনও ভাবে না যে রাজদেহে থাকিয়াই আমি রাজ-কার্য্য করিব, দরিদ্রের দেহে থাকিব না। জল এরূপ ব্যবহার জানে না যে গাভীর তৃষ্ণাই মিটাইব আর বিষ হইয়া ব্যাঘ্রের প্রাণ নাশ করিব। প্রাণীমাত্রের সহিত যাহার সমান মৈত্রী, যে স্বয়ং কৃপার আশ্রয়, যাহার অহঙ্কারের লেশ নাই, নিজের বলিয়া কিছু জানে না, সুখ দুঃখ ভাবহীন, পৃথিবীর ন্যায় ক্ষমাশীল, যে সন্তোষকে ক্রোড়ীকৃত করিয়াছে—
সন্তুষ্টঃ সততং যোগী যতাত্মা দৃঢ় নিশ্চয়ঃ।
ময্যর্পিত মনোবুদ্ধিৰ্যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ ১২।১৪
বর্ষা ভিন্নই সমুদ্র জল পূর্ণ থাকে, সেইরূপ যে উপহার বিনাই সন্তুষ্ট, অন্তঃকরণকে শপথ দিয়া অধীন রাখে, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যাহার হৃদয়-ভুবনে জীব ও পরমাত্মা এক আসনে উপবিষ্ট ; যোগসম্পন্ন হইলেও নিরন্তর যে মন বুদ্ধিকে আমাতে সমর্পিত রাখে, অন্তরে বাহিরে উত্তমরূপে যোগাসিদ্ধি লাভ করিলেও আমার প্রতি যাহার সপ্রেম অনুরাগ, হে অর্জ্জুন, সেই আমার ভক্ত। সে-ই যোগী আর সে-ই মুক্ত। সে আমার বল্লভা আমি তাহার কান্ত। সে আমার প্রাণের সমান প্রিয়, ইহা বলাও অল্পকথা। প্রেমিক ভক্তের কথা আমাকে মোহিত করিবার যাদু মন্ত্র। বর্ণনার বিষয় না হইলেও উহা প্রেমের জন্য না বলিয়া পারি না। প্রেমের বর্ণনা করা সম্ভব নয়। হে কিরীটি! প্রেমিকের কথায় প্রেমের মহিমা দ্বিগুণিত হয়, সেই কথা প্রেমিকের মুখে বর্ণিত হইলে অতুলনীয় মাধুর্য্য প্রকাশ হয়। হে পাণ্ডুনন্দন! তুমি আমার প্রেমিক, তুমিই শ্রোতা, আর প্রসঙ্গ বশে প্রেমিকের কথাই আরম্ভ হইয়াছে।
১৫
Page 16
এই প্রসঙ্গ বর্ণনা করিবার অবসর পাইয়া আমিও বড় সুখী হইলাম। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, যে ভক্তকে আমি হৃদয়ে বসাই তাহার লক্ষণ বলিতেছি শ্রবণ কর
(জ্ঞানেম্বরী)
যস্মান্নোদ্বিজতে লোকো লোকান্নোদ্বিজতে চ যঃ।
হর্ষামর্ষভয়োদ্বেগৈমুক্তো যঃ স চ মে প্রিয়ঃ ॥ ১২।১৫
সমুদ্র গর্জনে জলচরের ভয় হয় না। জলচর দ্বারা সমুদ্রেরও হানি হয় না। এই উন্মত্ত জগত হইতে যাহার খেদ উৎপন্ন হয় না, যাহার নিমিত্ত জগতের কেহ দুঃখিত হয় না, অধিক বলিব কি, হে পাণ্ডব! শরীর যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে ক্লেশ প্রাপ্ত হয় না সেইরূপ স্বয়ং জীব বলিয়া যে অপর জীব হইতে দুঃখ পায় না, জগৎকে নিজের দেহ স্বরূপ মনে করে বলিয়া যাহার প্রিয় ও অপ্রিয় ভাব চলিয়া যায়, অদ্বৈত জ্ঞানে হর্ষ ও ক্রোধের ভেদ থাকে না, যে সুখ দুঃখের দ্বন্দ্ব মুক্ত, ভয়ের আবেশ হীন, এবং আমার প্রতি ভক্তিমান, সেই ভক্তের প্রেমে আমি মোহিত। প্রেমিক আমার প্রাণের প্রাণ। যে আত্মানন্দে পরিতৃপ্ত, পূর্ণপ্রেমের অবতার সদৃশ, পূর্ণতারূপ স্ত্রীর প্রাণবল্লভ—
অনপেক্ষঃ শুচির্দক্ষ উদাসীনো গতব্যথঃ।
সর্বারম্ভ পরিত্যাগী যো মদ্ভক্তঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ ১২।১৬
হে পাণ্ডব! তাহার হৃদয়ে বাসনা প্রবেশ করিতে পারে না, তাহার অবস্থানে সুখের জোয়ার আসে। কাশীধাম মোক্ষ দান করিতে উদার, মোক্ষের নিমিত্ত সে স্থানে দেহ ত্যাগ করা প্রয়োজন। হিমালয় ভ্রমণ পাশ ধ্বংস করে, সেখানেও জীবন হানির আশঙ্কা। ভক্তের পবিত্রতা সেরূপ নয়। পবিত্রতায় গঙ্গা অদ্বিতীয়। উহাতে পাপ ও সন্তাপ দূর হয়, তথায়ও ডুবিয়া যাইবার ভয় আছে। ভক্তির গভীরতার শেষ নাই, তথাপি উহাতে ডুবিয়া যাইবার ভয় নাই। মৃত্যুভয় বিনাই মোক্ষ লাভ হয়। সাধুর সমাগমে গঙ্গাও পাপ মুক্ত হয়, তবে দেখ দেখি, সাধু সঙ্গের কতখানি পবিত্রতা। পবিত্রতার দ্বারা সে তীর্থেরও আশ্রয় দাতা, মন হইতে সে পাপকে দূরে সরাইয়া দিয়াছে, অন্তরে বাহিরে সূর্যের ন্যায় শুদ্ধ নির্মল ও দয়ানু মনুষ্যের ন্যায় দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন, আকাশের ন্যায় ব্যাপক ও উদাসীন যাহার মন, সংসারের সুখ দুঃখ যাহার চলিয়া গিয়াছে, নিরাশার অলঙ্কারে অলঙ্কৃত, ব্যাধের হস্তবিমুক্ত পক্ষীর ন্যায় সচকিত, নিরন্তর সুখে অবস্থান হেতু যে দুঃখের বার্তাও জানে না, মৃত মনুষ্যের ন্যায় লজ্জাহীন, কর্মারম্ভে নিরহঙ্কার, ইন্ধন অভাবে অগ্নি নির্বাণের ন্যায় মোক্ষের অঙ্গীভূত অনায়াসলব্ধ শান্তি পর্য্যন্ত আমার প্রতি ভাব পূর্ণ, সে দ্বৈতের ওপারে ভক্তিসুখ প্রাপ্তির নিমিত্ত নিজেকেই দুই ভাগে দেখিয়া এক অংশে সেবা করে, অপর অংশে আমার নাম দেয় এবং
১৬
Page 17
ভক্তি পরাঙ্মুখ জনকে উত্তম ভক্তির আচরণ প্রদর্শন করে। এরূপ যোগীতে আমার অত্যন্ত প্রীতি। সে আমার আত্মার স্বরূপ। তাহার সহিত মিলিত হইলে আমার শান্তি। তাহারই নিমিত্ত আমার রূপ প্রকাশ এবং প্রপঞ্চে অবতরণ। সে আমার এরূপ প্রিয় যে আমার প্রাণ দ্বারা তাহার নিৰ্ম্মঞ্ছন করি।
যো ন হৃষ্যতি ন দ্বেষ্টি ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।
শুভাশুভপরিত্যাগী ভক্তিমান্ যঃ স মে প্রিয়ঃ ॥ ১২।১৭ (জ্ঞানেম্বরী)
আমাকে লাভের সমান যে আর কিছুই উত্তম বলিয়া মনে করে না, এই হেতু বিশেষ ভোগ দ্বারা যাহার সন্তোষ হয় না, বিশ্বময় হইয়াছে বলিয়া ভেদভাবহীন এবং দ্বেষ-রহিত, বাস্তব পদার্থ কল্পনাতেও ধ্বংস হয় না, ইহা জানিয়া গত বিষয়ে শোকারহিত সর্বাতীত বস্তু স্বয়ং উৎপন্ন, এই নিমিত্ত কোন বস্তুর আকাঙ্ক্ষাহীন, সূর্য্য যেরূপ রাত্রি ও দিবস পার্থক্য নাই, সেইরূপ যাহার ভাল বা মন্দ প্রতীতি হয় না, এই প্রকার কেবল শুদ্ধ জ্ঞানময় হইয়াও যে আমার ভজন করে তোমার নামে শপথ করিয়া বলিতেছি, সে আমার অদ্বিতীয় প্রেমিক এবং স্নেহের পাত্র। (জ্ঞানেম্বরী)
সমঃ শত্রৌ চ মিত্রে চ তথা মানাপমানয়োঃ।
শীতোষ্ণসুখদুঃখেষু সমঃ সঙ্গবিবর্জিতঃ ॥ ১২।১৮
হে পাণ্ডব! গৃহস্থিত মনুষ্যকে আলোক দিব, অপরকে দিব না, প্রদীপ এরূপ ভাবে না। হে পার্থ! তাহার বিষম দৃষ্টি নাই, শত্রু মিত্রে সমান দৃষ্টি, যে বৃক্ষকে কাটিবার নিমিত্ত কুঠারের আঘাত করে, আর যে বীজ বপন করিয়াছে এই উভয়কেই বৃক্ষ সমানভাবে ছায়া দান করে, ইক্ষু ক্ষেত্র-রক্ষকের নিমিত্ত মধুর আর পেষণ-কর্তার নিমিত্ত কটু হয় না, হে অর্জ্জুন! যাহার ভাব শত্রু মিত্রের বিষয়েও মান অপমানে সম ; তিন ঋতুতেই সমান, আকাশের ন্যায় যে শীত ও উষ্ণকে এক মনে করে ; হে পাণ্ডব! দক্ষিণ ও উত্তর বায়ুতে অচল মেরুর ন্যায় সুখ ও দুঃখ সমাগমে যে উদাসীন ; চন্দ্রলোকের মাধুরী রাজা ও দরিদ্রের প্রতি সমান মাধুৰ্য্য বিস্তার করে ; সেইরূপ সমস্ত প্রাণীর সমীপে এক ভাব ; সকল জগতের সেব্য জলের ন্যায় ত্রিভুবনে যাহার চাহিদা, অন্তর বাহিরে বিষয়ের সঙ্গ ত্যাগ করিয়া যে আমাতে একান্তে স্থির হইয়া অবস্থান করে,—
তুল্যনিন্দাস্তুতিমৌনী সন্তুষ্টো যেন কেনচিৎ।
অনিকেতঃ স্থিরমতির্ভক্তিমান্ মে প্রিয়ো নরঃ ॥ ১২।১৯
যে নিন্দার ভয় করে না, স্তুতিতে কৃতার্থ হয় না ; আকাশের ন্যায় নির্লিপ্ত ভাবে নিন্দা ও স্তুতিকে এক পর্য্যন্তে রাখিয়া সংসারে অথবা বনে বিচরণ করে ; যে সত্য বা মিথ্যা পরিত্যাগ করিয়া মৌন হইয়াছে, উন্মনা অবস্থার ভোগে যে কখনও বঞ্চিত নয় ; বর্ষার অভাবে সমুদ্র শুষ্ক হয় না, যথা লাভে যে সন্তুষ্ট,
১৭
Page 18
অপ্রাপ্তিতে যাহার অসন্তোষ নাই ; বায়ু এক স্থানে স্থির ভাবে অবস্থান করে না সেইরূপ এক স্থানে আশ্রয় লইয়া যে বাস করে না, সর্ব আকাশব্যাপী বায়ুর ন্যায় সমগ্র জগত যাহার বিশ্রাম স্থল। বিশ্বকেই যে আপন গৃহরূপে জানিয়াছে, অধিক কি, যে নিজেই চরাচর বিশ্বরূপ, তদুপরি আমার ভজনে যাহার বিশ্বাস আছে, তাহাকে আমি মাথার মুকুট করিয়া রাখি। উত্তম জন্মের সমীপে মস্তক অবনত করা আশ্চর্য্যের বিষয় নয় ; ত্রিভুবন পূর্বোক্ত ভক্তের চরামৃতকে সম্মান করে। শ্রীশঙ্করের ন্যায় গুরু হইলেই শ্রদ্ধা ও প্রেমের রীতি বোধের বিষয় হইবে। সে কথা থাকুক, কারণ শঙ্করের মহিমা বলিলে আত্ম-স্তুতিই হইবে। শ্রীরামানাথ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—অর্জ্জুন, এরূপ ভক্তকে আমি মাথায় করিয়া রাখি। সেই ভক্ত মোক্ষরূপ চতুর্থ পুরুষার্থের সিদ্ধি করতলগত করিয়া ভক্তির পথে প্রবেশ করেন এবং জগতে উহা দান করেন। মোক্ষাকাঙ্ক্ষাবান বন্ধনমুক্ত সেই ভক্ত তদনুরূপ ব্যবহারে জলের ন্যায় নম্র স্বভাব। আমি এই নিমিত্ত তাহাকে নমস্কার করি, মাথার মুকুট করি, এবং তাহার চরণ হৃদয়ে ধারণ করি। তাহার গুণের কথায় বাণীকে অলঙ্কৃত করি ও তাহার কীর্ত্তি-শ্রবণ কর্ণের ভূষণরূপে গ্রহণ করি। তাহাকে দর্শনের নিমিত্ত অচক্ষু হইলেও আমি চক্ষু ইন্দ্রিয় অঙ্গীকার করিয়াছি, হাতের লীলাকমল দ্বারা আমি তাহার পূজা করি। তাহাকে আলিঙ্গন করিবার নিমিত্ত আমি আপন দ্বিভুজের উপর আরও দ্বিভুজ প্রকাশ করিয়াছি। ভক্ত সমাগম সুখ-লাভের নিমিত্ত দেহাতীত হইলেও দেহ প্রকাশ করি। অধিক বলিব কি, ভক্তের প্রতি আমার প্রেম অতুলনীয়। তাহাতে ও আমাতে প্রেম হইবে ইহা বিচিত্র নয়। ভক্তের চরিত্র যে শ্রবণ করে অথবা প্রশংসা করে, সেও আমার প্রাণ হইতে প্রিয় ; ইহাতে কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। হে অর্জ্জুন, সম্প্রতি ভক্তিযোগে আদ্যান্ত তোমাকে শুনাইলাম—এই যোগে স্থিত ভক্তকে আমি অত্যন্ত প্রীতি করি এবং তাহাকে সমাদরে মাথায় করিয়া রাখি। (জ্ঞানেম্বরী)
যে তু ধর্ম্যামৃতমিদং যথোক্তং পর্যুপাসতে।
শ্রদ্দধানা মৎপরমা ভক্তাস্তেঽতীব মে প্রিয়াঃ ॥
এই রমনীয় তত্ত্বকথা, ধর্মানুকুল অমৃতধারা শ্রবণপূর্ববক যে অনুভব করে, শ্রদ্ধার সহিত আদরের ফলে যাহার জীবনে ইহার বিস্তার হয়, হৃদয়ে স্থির ভাবে ধারণ করে এবং অনুষ্ঠান করে, আমার বর্ণনানুসারে যাহার মনের স্থিতি, উত্তম ক্ষেত্রে উপ্তবীজের ন্যায় আমাকে অত্যন্ত শ্রেষ্ঠ মানিয়া আমার প্রতি প্রেম-ভক্তি প্রদর্শন পূর্বক উহাই যথা সর্বস্ব বুঝিয়া এই প্রেম-ভক্তির পথ অবলম্বন করে ; হে পার্থ, সেই যোগী এবং তাহারই নিমিত্ত আমি চিরকাল উৎকণ্ঠিত। নিরন্তর ভক্তি কথায় প্রীতিমান সেই ব্যক্তিই তীর্থ এবং পুণ্যক্ষেত্র স্বরূপ জগতে পবিত্র। আমিও তাহার ধ্যান করি, উহাই আমার দেবার্চনা। তাহাকে
১৮
Page 19
ভিন্ন আমার কিছুই ভাল লাগে না। সে-ই আমার ব্যসন এবং সকল সামগ্রীর আশ্রয়। তাহার মিলনে ও দর্শনে আমার চিত্ত স্থির হয়। হে পাণ্ডুতনয়, যে আমার প্রেমিক ভক্তের মহিমা বর্ণনা করে, আমি তাহাকে পরম দেবতা বলিয়া মনে করি। হে রাজন, যিনি নির্মল, নিষ্কলঙ্ক, জগতের প্রতি কৃপালু, শরণাগত বৎসল, শরণ্য, দেবকার্য্য সহায়ক, বিশ্বপালন লীলাময়, শরণাগত-রক্ষণকারী, ধর্ম্ম ও কীর্ত্তি দ্বারা বিমল, অগাধ দানশীল বলিয়া সরল, অনুপম পরাক্রমে প্রবল পরাক্রমী হইলেও ভক্তিদ্বারা দৈত্যরাজ-বলির সমীপে আবদ্ধ, ভক্তি প্রিয়, ভক্তকর্তৃক অনায়াস লভ্য, ভৃত্যের সহায়, নিখিল কলাবিদ্যার ভাণ্ডার, ভক্ত রঞ্জন-কারী সেই বৈকুণ্ঠনাথ শ্রীকৃষ্ণ বলেন, আর ভাগ্যবান্ অর্জ্জুন শ্রবণ করেন।” (জ্ঞানেম্বরী শ্রীমৎ জ্ঞানদেব।)
শ্রীমদ্ভাগবতেও হরি ভক্তি পরায়ণ সন্তের প্রতি শ্রীভগবানের নিম্নলিখিত বাক্য দৃষ্ট হয় ঃ—
নিরপেক্ষং মুনিং শান্তং নির্বৈ রং সমদর্শনং।
অনুব্রজাম্যহং নিত্যং পূয়েয়েত্যঙ্ঘ্রি রেণুভিঃ ॥
অর্থাৎ যিনি এই সংসারে কিছুরই অপেক্ষা করেন না, সকল বিষয় হইতে উপরত হইয়া আমারই মনন চিন্তনে তল্লীন থাকেন এবং রাগদ্বেষাদি বর্জ্জিত হইয়া প্রাণীমাত্রে সমদৃষ্টি পোষণ করেন, সেই মহাত্মার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আমি নিরন্তর এই ভাবনা লইয়া গমন করি যেন তাঁহার গমনকালে তাঁহার চরণরেণু অঙ্গে পতিত হয় এবং আমি পবিত্র হই।
হরি ভক্ত পরায়ণ সন্তের মহিমা অমোঘ ও অসীম, এই নিমিত্ত শ্রীভগবানও সকল শাস্ত্র এই সন্তের যশ গাথা ও বন্দনায় মুখর এবং সন্তগণ তাঁহার স্তুতিতে ভাববিভোর। যথা ভক্তমালে ;
মঙ্গল আদি বিচারি রহ, বস্তু ন ঔর অনুপ।
হরিজনকো যশ গাবতে, হরিজন মঙ্গল রূপ ॥
সব সন্তন নির্ণয় কিযো স্মৃতি পুরাণ ইতিহাস।
ভজিবে কৈ দোই সুঘর, কৈ হরি, কৈ হরিদাস ॥
অগ্রদেব আজ্ঞাদঈ ভক্তন কে যশ গাউ।
ভবসাগর কে তরন কো, নাহিন ঔর উপাউ ॥ (ছপ্পয় ৪)
১৯
Page 20
ভক্তিস্বরূপ ঃ ভক্তির স্বরূপ নির্ণয় সম্বন্ধে ভক্তিসিদ্ধ দেবাষি, মহর্ষি ও মহাত্মাগণের সিদ্ধান্তগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে হইবে।
শ্রীনারদ ভক্তিসূত্রানুসারে ঃ
সূত্র-১—“সা ত্বস্মিন্ পরম প্রেম রূপা”—এই ভক্তি ঈশ্বরের প্রতি পরম প্রেম স্বরূপ।
সূত্র-২—“অমৃত স্বরূপা চ।”—এবং উহা অমৃত স্বরূপাও।
সূত্র-৩—“যল্লব্ধা পুমান্ সিদ্ধোভবতি, অমৃতো ভবতি, তৃপ্তো ভবতি।” অর্থাৎ যাহা প্রাপ্ত হইয়া মনুষ্য সিদ্ধ হয়, অমর হয়, তৃপ্ত হয়।
সূত্র-৪—“যৎপ্রাপ্য ন কিঞ্চিৎ বাঞ্ছতি, ন শোচতি, ন দ্বেষ্টি, ন রমতে, নোৎসাহী ভবতি।” অর্থাৎ যাহা প্রাপ্ত হইলে মনুষ্য কোন বস্তু প্রাপ্ত হইতে ইচ্ছা করে না, শোক করে না, কোন দ্বেষ করে না, তাহার অন্য কোন বস্তুতে আসক্তি থাকে না, এবং তাহার বিষয়ভোগের কোন উৎসাহ থাকে না।
সূত্র-৫—“যৎ জ্ঞাত্বা মত্তো ভবতি, স্তব্ধো ভবতি, আত্মারামো ভবতি।” অর্থাৎ পরমপ্রেমরূপ ভক্তি লাভ করিয়া মনুষ্য দিব্যোন্মাদ হয়, মৌন হয়, এবং আত্মারাম অর্থাৎ ব্রহ্মানন্দে পরিপূর্ণ হয়।
শ্রীমন্ নারদ ৫১ সূত্রে বলিতেছেন যে প্রেমের স্বরূপ অনির্বচনীয়—যথা “অনির্বচনীয়ম্ প্রেম স্বরূপম্”। ৫২ সূত্রানুসারে—“মূকাস্বাদনবৎ” অর্থাৎ মূকের আম্বাদতুল্য। ৫৩ সূত্রে তিনি বলেন উহা “প্রকাশতে কাপি পাত্রে” কদাচিৎ কোন পাত্রে এই পরাভক্তি শ্রীগুরুকৃপায় প্রকট হইয়া থাকে। সূত্র ৫৪—“গুণরহিতং কামনারহিতং প্রতিক্ষণবর্দ্ধমানমবিচ্ছিন্নং সূক্ষ্মতরমমুভবরূপম্।” অর্থাৎ এই প্রেম গুণরহিত, কামনারহিত, প্রতিক্ষণে উহা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, উহা বিচ্ছেদ রহিত, সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর, এবং অনুভব রূপ। পরাশরনন্দন মহামুনি বেদব্যাসের মতে শ্রীভগবানের পূজাদিতে অনুরাগকেKey ভক্তি বলিয়া কথিত হয়। শ্রীগর্গাচাৰ্য্যের মতে শ্রীভগবানের লীলাচরিতে অনুরাগই ভক্তি। মহর্ষি শাণ্ডিল্য বলেন যে আত্মরতির অবিরোধী বিষয়ে অনুরাগই ভক্তি। পরন্তু দেবর্ষি নারদ বলেন—“নারদস্তু তদর্পিতাখিলাচারিতা তদ্বিস্মরণে পরমব্যাকুলতেতি।” অর্থাৎ সকল কর্মফল শ্রীভগবানকে অর্পণ, এবং শ্রীভগবানকে মুহূর্তমাত্র বিস্মরণজনিত ব্যাকুলতাই ভক্তি। ২০ সূত্রে তিনি বলিতেছেন—“অস্ত্যেবমেবম্” অর্থাৎ এইরূপই যথার্থ। উদাহরণ স্বরূপ বলিতেছেন—“যথা ব্রজগোপিকানাম্।” অর্থাৎ যে প্রকার ব্রজগোপীগণের। আচার্য্য মধুসূদন সরস্বতী বলেন—“দ্রুতস্য ভগবদ্ধৰ্ম্মাধারাবাহিকতাং গতা—সর্বেশেমনসো বৃত্তি ভক্তিরিত্যভিধিয়তে।—( ভক্তিসূত্রায়ন ) অর্থাৎ ভগবত গুণ শ্রবণ ধারায় প্রবাহিত ভগবত বিষয়িনী ধারাবাহিক বৃত্তিকে
২০
পৃষ্ঠা
২১
ভক্তি।
বেদান্তকামধেনু গ্রন্থে শ্রীনিয়্যার্কাচার্য্য বলেন যে সৌন্দর্য্যসাগর
শ্রীসর্ব্বেশ্বর ভগবানের কৃপাকটাক্ষেই তাঁহার প্রতি প্রেমলক্ষণা ভক্তি স্ফূরিত হয়।
যাঁহার মধ্যে বিনয়তাদি গুণ বিলক্ষণরূপে বর্তমান তাঁহাকেই কৃপা করিয়া থাকেন। এই
ভক্তি পরা ও অপরা দ্বিবিধ। প্রেমরূপা পরা ও সাধনরূপা অপরা। উপরি উক্ত সকলই ভক্তি।
পরন্তু এই ভক্তির লক্ষণ কি প্রকার? শ্রীমদ্ভাগবতে
ইহার বর্ণনা রহিয়াছে যথা "বাকগদ্গদা দ্রবতে যস্য চিত্তং, রুদত্যভীক্ষ্ণং হসতি ক্বচিৎ। বিলজ্জ উদ্গায়তি নৃত্যতে চ
মদ্ভক্তিযুক্তো ভুবনং পুনাতি।।" অর্থাৎ যাহার বাণী প্রেমে গদগদ, চিত্ত দ্রবীভূত, ক্ষণমাত্রও
আমার বিরহে ক্রন্দনের বিরাম নাই, কখন কখন
অট্টহাস্য করে,
কখন নির্লজ্জভাবে উচ্চৈঃস্বরে
আমারই নামসঙ্গীত গাহিতে থাকে, কখন
আনন্দে নৃত্য করে,
হে প্রাতঃ উদ্ধব! আমার ভক্ত
কেবলমাত্র নিজেই পরম পবিত্র হয় এরূপ নহে; সে সকল
সংসার পবিত্র করিয়া থাকে।
ভগবান:—"ভগবান"
শব্দের ভ, গ, ব অক্ষরের সাংকেতিক অর্থ এই প্রকার দৃষ্ট হয় যথা ; ‘ভ’=সম্ভর্ত্তা, যিনি
প্রকৃতিকে কার্য্যযোগ্যা করেন, স্বামী
বা পোষক। ‘গ’=নেতা বা রক্ষক, সংহর্ত্তা
ও স্রষ্টা। ‘ব’=যিনি সর্ব্বভূতে বাস করেন এবং যাঁহাতে সর্ব্বভূত বাস করে অর্থাৎ
যিনি সকলের আশ্রয়। যথা— "সম্ভর্ত্তেতি ভর্ত্তা ভকারোর্থদ্বয়ান্বিতঃ। নেতা
গময়িতা স্রষ্টা গকারার্থস্তথা মুনে।.....বসন্তি তত্র ভূতানি ভূতাত্মন্যখিলাত্মনি স
চ ভূতেষ্বশেষেযু বকারার্থস্ততোহব্যয়।। ( বিষ্ণুপুরাণ )। উপযুক্ত গুণসম্পন্ন পুরুষই
ভগবান। ইহার সরল অর্থ ইহাই যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপাদান কারণ, নিমিত্তকারণ, তথা
উৎপত্তি-স্থিতি-লয় কারী, এবং
অন্তর্য্যামীত্ব গুণাদিয়ুক্ত পুরুষই ভগবান। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা—ভগঃ অস্যন্তি ইতি
ভগবান। সম্যক্ ঐশ্বর্য্য, সম্যক্
বীর্য্য, সম্যক্ যশ, সম্যক্ শ্রী, সম্যক্
জ্ঞান এবং সম্যক্ বৈরাগ্য এই বড় ঐশ্বর্য্য ভগঃ শব্দের অর্থ এবং যিনি এই ষড়
ঐশ্বর্য্যযুক্ত তিনি ভগবান। যথা—"ঐশ্বর্য্যস্য সমগ্রস্য ধর্ম্মস্য যশসঃ
প্রিয়ঃ। জ্ঞান বৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষন্ণাং ভগ ইতিরণা।।" তৃতীয় অর্থঃ
উৎপত্তিপ্রলয়ঞ্চৈব ভূতানামগতিংগতিং। বেত্তিবিদ্যামবিদ্যাস চ বাচ্যো ভগবান ইতি। (
বিষ্ণুপুরাণ ) অর্থাৎ যিনি জীবের উৎপত্তি, নাশ, আগমন, গমন, বিদ্যা ও অবিদ্যা জ্ঞাত তিনিই ভগবান। "পোষণং ভরণাধারং
শরণং সর্ব্বব্যাপকম্। কারুণাৎ ষড়ভিঃ পূর্ণো রামস্তু ভগবান স্বয়ং। ( মহারামায়ণ )
অর্থাৎ ভরণ-পোষণকর্ত্তা, শরণাগতজনকে
শরণ প্রদাতা, সর্ব্বব্যাপক, করুণাপূর্ণ এই ষড় গুণ দ্বারা পূর্ণ ভগবান শ্রীরাম।
চতুর্থ
অর্থঃ "সর্ব্বহেয়প্রত্যানীক কল্যাণগুণবত্তয়া। পূজ্যপূজ্যতমো যোহসৌ ভগবান ইতি
শব্দতে।” ( নিরুক্তি বিষ্ণু সহস্রনাম, শ্লোকবদ্ধ
টীকা ) অর্থাৎ
২১
পৃষ্ঠা
২২
বাহ্য
মায়িক গুণদোষ বিমুক্ত, কল্যাণগুণাদিয়ুক্ত
এবং সকল পূজ্যগণেরও পূজ্যকে ভগবান বলিয়া উক্ত হইয়া থাকে। ( পঃ অখিলেশ্বর দাস, মানস পীযূষ )
অতএব
ভক্ত, ভক্তি, ভগবান, গুরু
শব্দগুলি বর্ণনার সময় যদিও পৃথক পৃথক ভাবে বর্ণিত হয়, এই চারি নামের পরস্পর অন্যোন্যাশ্রয় সম্বন্ধ ইহা সুস্পষ্ট।
এই নিমিত্ত সন্তশিরোমণি শ্রীনাভাজী তাঁহার অমর সৃষ্টি ভক্তমাল গ্রন্থে প্রথমেই
ঘোষণা করিয়াছেন যে “ভক্ত, ভক্তি, ভগবন্তু গুরু চতুর নাম বপু এক।” ইহা হইতে আমরা একটি মাত্র
সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে সন্তসদগুরু চারি নামে অভিহিত হইয়া থাকেন এবং তাঁহার মধ্যে
এই চারি স্বরূপ পরিদৃষ্ট হয়। শাস্ত্রমতে হরিভক্তি পরায়ণ সন্তগণও শ্রীভগবানের
অবতার। কারণ শ্রীভগবানের অবতার অসংখ্য। যথাঃ
অবতারা
হাসংখ্যেয়া হরেঃ সত্ত্বনিধের্দ্দিজাঃ।
যথাবিদাসিন
কুল্যাঃ সরসঃ স্যুঃ সহস্রশঃ।। ( শ্রীমদ্ভাগবত ১।৩।২৬ )
অর্থাৎ
যে প্রকার বিশাল সরোবর হইতে সহস্র জলস্রোত নির্গত হয় সেই প্রকার সত্ত্বনিধি ভগবান
শ্রীহরির অসংখ্য অবতার হইয়া থাকে।
যদ্ যদ্
বিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমদুর্জ্জিতমেব বা।
তত্তদেবাবগচ্ছ
ত্বং মম তেজোংহশ সম্ভবম্।। ( শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতা ১০।৪১ )
যে
পুরুষে কোন বিশেষ তেজ, তপঃ অথবা
বিভূতি পরিলক্ষিত হয় সেই পুরুষ আমারই বিশেষ কলা অংশ হইতে সম্ভূত হইয়াছে।
অতএব
দেখা যাইতেছে সকল সংশ্লেষের সারাংশ ইহাই যে শুদ্ধ সন্তের দর্শন, স্পর্শন, সান্নিধ্য, সেবা, গুণগান, তাঁহার চরিত শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন আদি মহাপবিত্র কারক হইয়া থাকে।
এবম্প্রকার
শুদ্ধসন্তগণ মধ্যে মদীয় শ্রীগুরুদেব আচার্য্যপাদ অনন্তশ্রী স্বামী শ্রীবাসুদেবদাসজী
ত্যাগী মহারাজ এক বিশুদ্ধ সন্ত যিনি দ্বাদশবৎসর বয়ঃক্রম হইতে সন্তবেশ ধারণ
পূর্ব্বক সর্ব্বদা সংসাররূপী সলিলে শতাধিক বর্ষ কমলবৎ অবস্থান করিয়াছেন। এই
গ্রন্থে তাঁহার বৈরাগ্যবেশ ধারণ কাল হইতে মর্ত্যলীলা অবসান পর্য্যন্ত এক চিত্র
অঙ্কনের প্রয়াস করা হইয়াছে। পরন্তু এই চিত্র সম্পূর্ণ নহে একথা নিঃসন্দেহে বলা
যাইতে পারে। কারণ সন্তের চরিত অনন্ত ও অগাধ। এই নিমিত্ত ভক্ত সন্ত চরিত “ভক্তমাল”
রচনা করিতে স্বীয় গুরুদেব কর্তৃক আদিষ্ট হইলে শ্রীনাভাজী মহারাজ বলিয়াছিলেন—
“বোল্যো
কর জোরি, যাকো পাবত ন ওর ছোর, গাউঁ রামকৃষ্ণ
নহি পাউঁ
ভক্তি দাব কো।”
অর্থাৎ
শ্রীনাভাজী কর জোড়ে শ্রীগুরু অগ্রদেবদাসজীকে বলিলেন ভগবনূ! আমি শ্রীরামকৃষ্ণের
চরিত কিঞ্চিৎ গান করিতে সক্ষম পরন্তু সন্তের চরিতের
২২
পৃষ্ঠা
২৩
গভীরতা
এরূপ যে উহার তলদেশে যাইতে সক্ষম নহি। অর্থাৎ সন্তের রহস্য অতীব গভীর, সন্তের ভান্তর রহস্য জ্ঞাত হইতে সক্ষম নহি।” সন্তের জীবন
গুরুদীক্ষা ও বৈরাগ্যবেশ গ্রহণকাল হইতে প্রারম্ভ হইয়া থাকে এবং পরাবৈরাগ্য বশতঃ
পূর্ব্ব জন্মজীবনের ( পূর্ব্বাশ্রমের ) নাম, ধাম, রূপ ও জ্ঞান রূপান্তরিত হইয়া যায়—উহার জাগতিক জন্মের দেশ কাল
জানা অসম্ভব হইয়া পড়ে। কারণ তাঁহার পূর্ব্বস্মৃতি প্রভুর চরণে আত্ম-অবলুপ্তির
আত্মবিস্মৃতির নিমিত্ত লুপ্ত হইয়া যায়। পরাবৈরাগ্যবান হরিভক্তি পরায়ণ সন্তগণের
মার্ম্মিক উপদেশ ইহাই। যদি ভুলবশতঃ কোন সন্তের পূর্ব্বাশ্রমের দেশকাল স্মরণে উদিত
হয়, তাঁহার বৈরাগ্য পূর্ণ নহে জানিতে
হইবে। প্রভুর চরণে আত্ম অবলুপ্তি না হইলে পরাবৈরাগ্য উদয় অসম্ভব। স্পর্শমণির
স্পর্শে লৌহ সুবর্ণে পরিণত হইলে সেই সুবর্ণের মধ্যে লৌহের কণা মাত্রও লক্ষিত হয় না, যাহাতে লৌহ ও সুবর্ণ পৃথক্বরূপে প্রতিভাত হইতে পারে।
পরাবৈরাগ্যবান হরিভক্তি পরায়ণ সন্তের মনে নির্ব্বাক্ছিন্ন তৈলধারাবৎ একটি মাত্র
স্বরূপ—প্রভুর দাসানুদাস জ্ঞান থাকে। বঙ্গদেশে আবির্ভাবকালে নাটের মহারাজ
শ্রীজগদ্দীন্দ্রনাথ রায় আচার্য্য পাদ শ্রীমহারাজজীকে তাঁহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলে
শ্রীমহারাজজী নিম্নোক্ত উত্তর প্রদান করিয়াছিলেন ইহা গ্রন্থের যথাস্থানে বর্ণিত
হইয়াছে—
নাহং
বিপ্রো ন চ নরপতিনাপি বৈশ্যো ন শূদ্র।
নাহং
বর্ণী ন চ গৃহপতিনো বনস্থো যতির্বা।।
কিন্তু
প্রোদ্যন্নিখিল পরমানন্দ পূর্ণামৃতাব্ধে।
লক্ষ্মীবর্ত্তুপদকমলয়োর্দ্দাসদাসানু
দাসঃ।।
এইরূপ
পরিস্থিতিতে পরাবৈরাগ্য সম্পন্ন সন্তশিরোমণি শ্রীগুরু মহারাজের এই লৌকিক দেহ
ধারণের দেশকাল সম্বন্ধে আমরা অনভিজ্ঞ। তাঁহার জন্মস্থান, তাঁহার পিতামাতা, বাল্যকাল
প্রভৃতির সম্বন্ধে অবহিত কাহারও সাক্ষাৎ লাভ হয় নাই। সাধারণতঃ শ্রীমহারাজজী
ভাবগম্ভীর সহজ সমাধি অবস্থায় অবস্থান করিতেন। যোগীশ্রেষ্ঠোচিত অসাধারণ
গাম্ভীর্য্যের অনির্ব্বচনীয় সমাবেশ, বিশিষ্ট
সম্ভ্রান্ত পুরুষের ন্যায় মর্য্যাদাবোধ ও শিষ্টাচার তাঁহার লৌকিক জীবনের বৈশিষ্ট্য
ছিল ; পরন্তু তিনি ইচ্ছা না করিলে কেহই
তাঁহাকে কোন প্রশ্ন করিতে সাহসী হইত না। কোন অন্তরঙ্গ ভক্ত তাঁহার পূর্ব্বাশ্রম, পিতামাতো, জন্মভূমি
অথবা বয়ঃক্রম সম্বন্ধে প্রেমের সহিত জিজ্ঞাসা করিলে শুধুমাত্র বলিতেন ইয়ে
প্রপঞ্চসে ক্যা হোগা, প্রপঞ্চ
মাং করো।” সুতরাং তাঁহার শ্রীমুখ হইতে এই সকল বিষয় জানার কোন উপায় ছিল না।
শ্রীমহারাজজী
যখন স্থূলদেহে বিদ্যমান ছিলেন, তখন
কয়েকবার উপযুক্ত অবসরে তাঁহার নিকট তাঁহার জীবনী লিখিবার প্রস্তাব করা হইয়াছিল।
তিনি
২৩
পৃষ্ঠা
২৪
প্রতিবারই
গম্ভীরভাবে বলিয়াছিলেন “জীবনীসে ক্যা হোগা” অথবা “প্রপঞ্চসে ক্যা হোগা”। এইরূপ
বলিয়া পুনরায় বলিতেন “করনী করো” অর্থাৎ যাহা উপদিষ্ট হইয়াছে উহাদের অনুশীলন কর, উহা জীবনে রূপায়িত কর উহা করিলেই জীবন সফল হইবে।
বাস্তবিকই
জীবন ও জীবনী—দুইটি পরস্পরের সহিত সম্বন্ধ বিশিষ্ট হইলেও পরস্পর হইতে পৃথক। জীবন
ভিতরের জীবনী বাহিরের—জীবন বিম্ব, জীবনী
প্রতিবিম্ব। সন্ত হৃদগতঃ যাহা তাঁহার অন্তরাত্মা যথার্থতঃ যেভাবে অভিব্যক্ত হয়, তাহাই তাঁহার জীবন। তিনি বিশিষ্ট দেশ, কাল, ও
অবস্থার মধ্যে অবস্থান করিয়া যে সকল কর্ম্ম করেন এবং তাঁহার আবেষ্টনের উপর যে
প্রভাব বিস্তার করেন তাহা দ্বারা তাঁহার জীবনী প্রথিত হয়। পরন্তু জীবনী মূলতঃ
জীবনেরই বহিপ্রকাশ হইলেও উহার মধ্যে নানা যোগ বিভূতির মিশ্রণ থাকে ; অবস্থা বিশেষে উহা এরূপ আকার ধারণ করে যে প্রকৃত জীবন উহাতে
আবৃত হইয়া যায় ;
এই সকলের মধ্য হইতে যথার্থ
জীবনটিকে চিনিয়া লওয়া দুষ্কর হইয়া থাকে। সার্থকনামা সন্তের আভ্যন্তরীন জীবন মানব
সমাজ ও ভক্তগণের এক স্থায়ী অমূল্য সম্পদ এবং তাহার একটি সুস্পষ্ট ও জীবন্ত চিত্র
অঙ্কিত করিয়া রাখিতে পারিলে দেশ কাল ও অবস্থার পরিবর্তন সত্ত্বেও চিরদিনই তাহা
মানব প্রাণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। পরন্তু তাঁহাদের লোক কল্যাণ নিমিত্ত অলৌকিক
বিভূতি সমূহ বাহ্যমুখী লোকের সহজেই নয়নগোচর হয় এই নিমিত্ত তাহারা সন্তের এই বাহ্য
বিভূতিগুলি জানিবার জন্য যতটা ব্যগ্র সন্তের জীবন বুঝিবার জন্য ততটা কৌতুহলী ও
প্রবৃত্তি শীল নহে। বোধ করি এই কারণে আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজী এই সকল চমৎকারিত্ব
হইতে বারংবার সতর্ক করিয়া বলিতেন প্রকৃত ভক্ত নিকট এই অলৌকিক বিভূতি তৃণবৎ তুচ্ছ
এবং ইহাদের প্রতিদৃষ্টিপাত না করিয়া শ্রীরামভজনে নিরন্তর তৎপর হইতে উপদেশ করিতেন।
এমন কি ইহাও বলিতেন যে যে স্থানে এই সকল যাদু দেখিবে সেই স্থান পরিত্যাগ করিবে।
সকল সন্তের জীবনে কিছু না কিছু অলৌকিক বিভূতির সমাবেশ দেখা যায় এবং আচার্য্যপাদের
জীবনেও উহা ছিল। পরন্তু তিনি কেবলমাত্র লোক কল্যাণ নিমিত্ত এরূপ ভাবে সংঘটিত
করিতেন যে মনে হইত উহা যেন স্বাভাবিক ভাবেই হইয়াছে যাহাতে ভক্তগণের মন বিভূতি সমূহ
আকৃষ্ট না হয়।
কাশীর
উত্তর প্রান্তে বরুণা নদী তীরে তপোধন আশ্রমে কাশী, বঙ্গদেশ, উত্তর
ভারতের বিরক্ত,
গৃহস্থ শিষ্যগণ আচার্য্যপাদ
শ্রীমহারাজজীর সত্তর, আশী
বৎসরের অনুভূত স্মৃতি, প্রভাব, প্রেরণা, চমৎকারিত্ব
ও সময় সময়ে শ্রুত উপদেশাবলীর আলোচনা পূর্ব্বক বারংবার এই সিদ্ধান্তে উপনীত
হইয়াছিলেন
২৪
পৃষ্ঠা
২৫
যে
অগ্রবর্ত্তিকা সদৃশ পথ প্রদর্শনের নিমিত্ত উত্তম প্রেরণাপূর্ণ আদর্শ সংস্থাপিত
হওয়া আবশ্যক যাহাতে যুগপত বর্তমান সদ্গৃহস্থ শিষ্যগণ ও বিরক্ত শিষ্যগণ আচার্য্যপাদ
শ্রীমহারাজজীর জীবন ও উপদেশ হইতে স্বীয় পার্থিব ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করত জগতের
সুখ শান্তি এবং সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করিতে সক্ষম হয়। পরন্তু প্রচার বিমুখ
শ্রীরামচরণে লয়লীন আচার্য্যপাদের এই বিষয়ে একান্ত অপ্রবৃত্তি জানিয়া ভক্তগণ
তাঁহাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিতে সাহসী হইতেন না। আচার্য্যপাদের জীবন ও জীবনী
সম্বন্ধে কলিকাতাস্থিত ভক্তগণের বিশেষ উৎসাহ ছিল। কিন্তু কলিকাতার অবস্থানকালে কোন
এক প্রবীণ ভক্তশিষ্যকে প্রশ্নোত্তর প্রদানকালে বলিয়াছিলেন “প্রচার হইলে জনসাধারণের
এরূপ সংঘট্ট হইবে যে তাঁহাকে অন্তর্ধান করিতে হইবে। ইহা যদি আপনার অভিপ্রেত হয়, প্রচার করুন, কিন্তু
স্থূল শরীরে আমার দর্শন আর পাইবেন না।” এই কারণে ভক্তশিষ্যগণ, যাহারা দীর্ঘকাল আচার্য্যপাদের সান্নিধ্য লাভ করিয়াছেন, আচার্য্যপাদের জীবনী রচনায় উৎসাহী ছিলেন না।
অযোধ্যধামে
১৯৭৫ খৃষ্টাব্দে অবধেশকুমার মন্দিরের স্থাপনা ও সংবৎসরব্যাপী অখণ্ড হরি সংকীৰ্ত্তন
অন্তে বৃহৎ সন্তভাণ্ডারার পরম পবিত্র আয়োজনে সমাগত ভাগবত, ভক্ত ও বিরক্ত শিষ্যগণ একত্র হইয়া একনিষ্ঠ সেবক শ্রীভাগবত
দাস রামায়নী মহারাজকে পুনরায় সপ্রেম সাগ্রহ অনুরোধ করিলেন যে “আমরা অনেক বৎসর
আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজীর জীবনী প্রকাশিত হইতে অভিলাষ পোষণ করিতেছি।”
আচার্য্যপাদের অমর জীবনগাথা ও সদুপদেশ সমূহের প্রকাশনে সর্ব্বপ্রকার সহযোগিতা এবং
সেবাৰ্থে বঙ্গদেশীয়, উত্তরভারতীয়
ও গুজরাট দেশীয় ভক্তগণ ব্যয়ভার বহন করিবার অঙ্গীকার ও আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজী
সম্বন্ধে তাঁহাদের ব্যক্তিগত অনুভব সমূহের উল্লেখ করত তাঁহাদের দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত
করিয়াছিলেন। এই বিষয়ে তাঁহাদের দৃঢ়সংকল্প দেখিয়া শ্রীভাগবত দাসজী আচার্য্যপাদের
চরণে অনুমতি প্রদান নিমিত্ত প্রার্থনা করিয়াছিলেন। জ্যেষ্ঠ বিরক্ত গুরুভ্রাতা
শ্রীকাশীদাসজী মহারাজও এই সৎকার্য্যের অনুমোদন করত আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজী হইতে
তাঁহার শতাব্দি পূত্তি উৎসব উপলক্ষে তাঁহার জীবনামৃতের প্রকাশনের আজ্ঞা প্রাপ্ত
হইলেন। বেশ কিছু বৎসর যাবৎ সময়ে সময়ে শ্রীভাগবতদাস রামায়নী মহারাজ দ্বারা সংগৃহীত
ও লিখিত আচার্য্যপাদের জীবনের বিবিধ প্রসঙ্গ, সৎ উপদেশ
ও ভক্তগণ প্রদত্ত তাঁহাদের অনুভূতি সমুদয়ের ঋণবদ্ধরূপে সঙ্কলনের কার্য্য ও
মুদ্রণের ব্যবস্থা হইতে লাগিল। ১৯৮১ খৃষ্টাব্দে চৈত্রমাসে সন্তসমাজ কর্তৃক
আচার্য্যপাদের অভিনন্দন সমারোহ উৎসবে শ্রীভাগবতদাস রামায়নী মহারাজ
২৫
পৃষ্ঠা
২৬
কর্তৃক
হিন্দি ভাষায় রচিত “অভিনন্দন গ্রন্থ এবং দিব্য-জীবন দর্শন” আচার্য্যপাদের করকমলে
সাদরে সমর্পিত হইয়াছিল। আচার্য্যপাদের বাক্য সত্যে পরিণত হইল। এই প্রকাশনের কয়েক
মাস পরে ১৯৮১ খৃষ্টাব্দে ২৬শে অক্টোবর ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু আচার্য্যপাদ ভক্তগণের
ইচ্ছা পূর্ণ করিয়া অন্তর্ধান করিলেন।
আমরা
সাধারণতঃ, জীবনী বলিতে যাহা বুঝি, এবং সাধারণতঃ জীবনী যেভাবে লিখিত হইয়া থাকে, তাহাতে এই গ্রন্থকে জীবনী গ্রন্থ বলা যায় কিনা এ বিষয়ে
যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। শ্রুতি, পুরাণ, পূর্ব্বাচার্য্যগণের বাণী ও তাঁহাদের জীবনবৈশিষ্ট্য, অনুভূতি ও বিচারের সাহায্যে আচার্য্যপাদের লোকোত্তর জীবনটাই
ধরিবার প্রয়াস করা হইয়াছে। এই গ্রন্থে যে সকল প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হইয়াছে উহা
আচার্য্যপাদের লোকোত্তর জীবনটি বুঝিবার জন্য ইঙ্গিত মাত্র। পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে
যে ক্রিয়াকলাপ ও বাহ্যিক ঘটনা পরম্পরা প্রভৃতি যে সকল উপকরণ দ্বারা জীবনী রচিত হয়
আচার্য্যপাদের ব্যবহারিক জীবনে স্বভাবতই সে সকলের অভাব। ইহা সত্ত্বেও
স্বাতীনক্ষত্রের মেঘের এক বিন্দু বারি পানে চাতকের যে প্রকার সন্তোষ হয়
আচার্য্যপাদরূপ স্বাতীনক্ষত্রের জীবনরসায়নরূপ এক বিন্দু এই জীবনী গ্রন্থ পাঠ করিয়া
ভক্তগণরূপ চাতক সন্তোষ লাভ করিবেন সন্দেহ নাই। ভক্তিশাস্ত্র চাতকের এক নিষ্ঠ
প্রেমের গুণগানে মুখর কারণ চাতকের প্রেম অনন্য চাতকের জন্যই স্বাতীনক্ষত্রের মেঘের
জল বর্ষণ। সেই প্রকার ভক্তগণ নিমিত্ত আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজীর কৃপা বারি বর্ষণ।
চাতক যেরূপ ধন্য,
আচার্য্যপাদের ভক্তগণও ধন্য।
ভক্তই ভগবানকে প্রকাশ করে সেই প্রকার ভক্তগণ তাঁহাকে প্রকাশ করিলেন। আচার্য্যপাদ
মহাসিন্ধু ভক্তগণ মেঘস্বরূপ, তাঁহারা
যে সকল আচার্য্যপাদের প্রতি স্বীয় অনুভূতি বর্ষণ করিয়াছেন উহা এই গ্রন্থে
সন্নিবেশিত হইয়াছে। আচার্য্যপাদ চন্দন তরু, ভক্তগণ
সমীর স্বরূপ—তাঁহারাই আচার্য্যপাদের বারতা লোকসমাজে বহন করিলেন। এই নিমিত্ত
আচার্য্যপাদের ভক্তগণের,—গুরুভ্রাতাগণের
চরণে মস্তক রাখিয়া প্রণাম করিতেছি। ভক্তগণচরণে নিবেদন এই যে আচার্য্যপাদ
শ্রীমহারাজীর ইচ্ছায় বঙ্গভাষায় এই গ্রন্থ প্রকাশিত, পরন্তু যাঁহাকে তিনি বঙ্গভাষায় লিখিতে আজ্ঞা দিয়াছিলেন তাঁহার বঙ্গভাষায়
ব্যুৎপত্তি নাই। এই নিমিত্ত তাঁহার লিখিত বঙ্গভাষায় অনেক দোষ বর্তমান। এই নিমিত্ত
শ্রীমদ্ভাগবতের নিম্নলিখিত শ্লোকটির প্রতি ভক্তগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আবশ্যক বোধ
হইতেছে :—
২৬
পৃষ্ঠা
২৭
“ন
যদ্বচশ্চিত্র পদং হরের্যশো, জগৎ
পবিত্রং প্রগুণীত কর্হিচিৎ।
তদ্বায়সং
তীর্থমুশন্তি মানসা ন যত্র হংসা নিরমন্ত্যশিক্ষয়াঃ।।
তদ্
বাগবিসর্গো জনতাঘবিপ্লবো, যস্মিন
প্রতিশ্লোকমাবদ্ধবত্যপি।
নামান্যনন্তস্য
যশোঽঙ্কিতানি যচ্ছৃণ্বন্তি গায়ন্তি গৃণন্তি সাধবঃ।।” ( ১।৫।১০,১১ )
অর্থাৎ :
বাণী যতই রস-ভাব-অলঙ্কারাদি যুক্ত হউক না কেন, যদি জগত পবিত্রকারী শ্রীভগবানের যশোগাথা উহাতে না থাকে, সেই বাণী বায়সগণ নিমিত্ত আবর্জ্জনা নিক্ষেপ করিবার স্থান
সদৃশ অপবিত্র মান্য করা হয়। মানস সরোবর সলিলে বিচরণশীল হংসগণ সদৃশ ব্রহ্মধামে
বিহারকারী ভগবচ্চরণারবিন্দ আশ্রিত পরমহংস ভক্তগণ কখনও উহাতে বিচরণ করেন না। ইহার
বিপরীত যাহাতে সুন্দর রচনা নাই এবং দূষিত শব্দযুক্ত পরন্তু প্রতি শ্লোক
শ্রীভগবানের সুযশ সূচক নাম দ্বারা সংযুক্ত সেই বাণী সকল পাপ নাশক ; কারণ সন্তগণ এইপ্রকার বাণী শ্রবণ, গান ও কীর্ত্তন করিয়া থাকেন।
পরিশেষে
আচার্য্যপাদ শ্রীমহারাজজীর স্থূল শরীরের বর্ণনা প্রদত্ত হইল। তাঁহার পবিত্র
শিরোপরি বিশাল মসৃণ জটাজাল, দিব্য
তেজোদ্দীপ্ত কান্তিমান উন্নত ললাট যাহার উপর মলয়গিরি চন্দন তথা অরুণ শ্রী দ্বারা
অঙ্কিত মনোহর বিরাট আকর্ষক উর্দ্ধ পুণ্ড্র তিলক, আকর্ণান্ত প্রভাবোন্মেষী মৎস্যাকৃতি দীর্ঘ নয়ন যুগল, সুন্দর সুডোল সুলক্ষণ দীর্ঘ নাসিকা, বিশাল কর্ণযুগল, অনতিদীর্ঘ
দন্তাবলী, সুসম্পন্ন প্রতিভা প্রকাশক
শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল, দীর্ঘগ্রীবা, কপাট পুট প্রমাণ বক্ষ, অনুন্নত
উদর, আজানুলম্বিত বাহু, রক্তাভ শঙ্খচক্রাঙ্কিত করপল্লব তথা সুস্পষ্ট সরল শোভনীয় রেখা
চিহ্ন সমন্বিত অঙ্গুলী, মণিকান্তন
রেখাযুক্ত হস্তবলয়,
সুগ্রন্থিত জানুদ্বয়, তথা উর্দ্ধরেখা দ্বারা সুবিভূষিত শ্রীচরণারবিন্দ যুগল, লঘু ঋজু ছয়ফুট দীর্ঘ শ্যামবর্ণ কায়াধারী, শ্বেত বস্ত্র পরিহিত, কাষ্ঠপাদুকাধারী, বাহুযুগলে তপ্ত ধনুষ্ট্বাণ চিহ্ন অঙ্কিত, মৃদু মধুরভাষী, স্মিত
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কর্ম্মঠ নৈষ্ঠিক স্বস্থ শতায়ু পূর্ণ শরীর এবং ভক্তি
উৎসাহ—পূর্ণ-যুব-বিবেকী মন, চৈতন্যবান্
সত্তা কাহাকে না আনন্দ দান করে? ইহাই
মদীয় গুরুদেবের ভৌতিক শরীর।
হে দেব !
আপনার কটাক্ষ মধুর,
অমৃতশ্রাবী আপনার বচন, সুমধুর স্মিত হাস্য, নির্ম্মল
সলিলে ভাসমান কমল সদৃশ নয়ন, সহজ
সমাধি সকলের মন হরণ করিয়াছে।
কর্ত্তু,মভর্ত্তু মন্যথাকর্ত্তুং সমর্থঃ ! যথা অন্তোদ্বিঃ স্থূলতাং
স্থূল জলধিতাং
ধূলিলব
শৈলজং,
শৈলো
মৃৎকণতাং তৃণং কুলিশতাং বজ্রং তৃণক্ষীণতাং। বহ্নি শীতলতাং
হিমং
বহনতামায়াতি যস্যেচ্ছয়া, লীলা
দুর্ললিতাদ্ ভূতবাসিনো
বাসুদেবায়
তস্মৈ নমঃ।
২৭

Comments
Post a Comment