অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব
দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 4)
বৈরাগ্য বেশ গ্রহণ
জানকী
বল্লভো বিজয়তে || শ্রী সীতারামাভ্যাং নমঃ || শ্রী হনুমতে নমঃ
লেখনীতে: কিশোর দাস (শ্রী মহারাজ জির কৃপাপ্রাপ্ত শ্রী
রাম কিশোর ভট্টাচার্য)
নমস্কার ও জয় সিয়ারাম,
রামানন্দী সম্প্রদায়ের ভাস্কর, পরম পূজনীয় মহান সাধক এবং আমাদের পরম গুরুদেব অনন্ত শ্রী আচার্যপাদ শ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী
ত্যাগী মহারাজ-এর চরণে
কোটি কোটি দণ্ডবৎ প্রণাম।
যাঁদের পুণ্যময় জীবন, অলৌকিক কর্মসাধন এবং অমৃতময় উপদেশ আমাদের
আধ্যাত্মিক পথের আলোকবর্তিকা, সেই মহাপুরুষের দিব্য জীবনগাথা কোনো একটি লেখায় বা একবারে প্রকাশ করা
অসম্ভব। শ্রী মহারাজ জির অহৈতুকী কৃপা এবং আদেশে, তাঁর সেই আলোকোজ্জ্বল জীবন, সাধনকাল এবং কল্যাণময়ী শিক্ষাকে আমরা এই মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে (বিভিন্ন পর্বে) আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি।
"মহাপুরুষদের
জীবন কথা কেবল পড়ার জন্য নয়, তা নিজের জীবনে ধারণ করে পরমার্থ লাভের পথ প্রশস্ত করার জন্য।"
শ্রী মহারাজ জির পরম কৃপাধন্য শিষ্য শ্রী কিশোর দাস (শ্রী রাম কিশোর ভট্টাচার্য) মহাশয়ের লেখনীর মাধ্যমে গুরুদেবের জীবনের
অন্তহীন অমৃত-কথা পর্বানুসারে নিয়মিত পোস্ট করা হবে। আশা করি, শ্রী মহারাজ জির এই জীবন-প্রসঙ্গ আপনাদের সকলের
হৃদয়কে ভক্তি ও শান্তিতে ভরিয়ে তুলবে এবং আধ্যাত্মিক মার্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য
করবে।
গুরুদেবের চরণে প্রার্থনা জানিয়ে আসুন আমরা
সবাই মিলে এই পুণ্যময় কথামৃতের আস্বাদ গ্রহণ করি।
জয় শ্রীরাম। জয় গুরুদেব।
----------------------------
পৃষ্ঠা ২৮
দ্বিতীয়
অধ্যায়
বৈরাগ্য বেশ গ্রহণ
রামস্য
নামরূপং চ লীলাধাম পরাৎপরম্।
এতচ্চতুষ্টয়ং
নিত্যং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহম্॥ ( বশিষ্ঠ
সংহিতা )
প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের নাম রূপ লীলাধাম এই সকলই
তাঁহার সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। সাকেতধাম অর্থাৎ অযোধ্যাপুরীকে অথর্ববেদ দেবগণের পুরী
বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন—"অষ্টচক্রা নবদ্বারা দেবানাং পূরযোধ্যা"।
বৃদ্ধযামল তন্ত্রে ভগবান শঙ্কর দেবী পার্বতীকে বলিয়াছেন :—
অযোধ্যা
চ পরম ব্রহ্ম সরযূঃ সগুণ পুমান্।
তন্নিবাসি
জগন্নাথঃ সত্যম্ বদাম্যহম্॥
অযোধ্যা
দর্শনে দেবি দিব্যদেহমবাপ্নুযাৎ।
ন
দুর্গতিমবাপ্নোতি সিদ্ধিং প্রাপ্নোতি চোত্তমাম্॥
ইহার অর্থ—সাকেত ধাম পরব্রহ্ম এবং সরযূ সগুণ
ব্রহ্ম, ইহার নিবাসি
প্রভু জগন্নাথ শ্রীরামচন্দ্র সতাসত্যই বলিতেছি ; হে দেবী অযোধ্যা দর্শনমাত্র মনুষ্য দিব্য দেহ প্রাপ্ত হয়, তাহার সর্বসিদ্ধি হয় ও তাহার কোন দুর্গতি হয় না।
স্কন্দ পুরাণে নিম্নলিখিত শ্লোকে সাকেত ধামের মহিমা বর্ণনা করা হইয়াছে।
মন্বন্তর সহস্রেস্তু কাশী বাসেমু যৎফলম্। তৎ ফলম্ সমবাপ্নোতি সরযূ দর্শনে কৃতে॥ مথুরায়াং কল্পমেকং মানবো বসতি যদি। তৎ
ফলম্ সমবাপ্নোতি সরযূ দর্শনে কৃতে॥ ষষ্টি বর্ষ-সহস্রাণি ভাগীরথ্যবগাহনম্। তৎ
ফলম্ নিমিষার্দ্ধং কলোদাশরথীং পুরীম্॥
অর্থাৎ সহস্র মন্বন্তর কাশীধামে যে মোক্ষ
ফলপ্রাপ্ত হওয়া যায় সেই মোক্ষফল সরযূ দর্শন মাত্রে হইয়া থাকে। মথুরা পুরীতে
কল্পকাল বাস করিলে যে ফল লাভ হয় সরযূ দর্শনে সেই ফল লাভ হয়। ষষ্টি সহস্রবর্ষ
গঙ্গাস্নানে
পৃষ্ঠা ২৯
যে ফল, এই কলিকালের শ্রীরামচন্দ্রের ধাম অযোধ্যাধামে অর্দ্ধ নিমিষে প্রাপ্ত হওয়া
যায়। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বলিয়াছেন :—
যদ্যপি সব বৈকুণ্ঠ বখানা। বেদ পুরাণ বিদিত জগ জানা॥ অবধপুরী
সম প্রিয় নহি সোঊ। রূঢ় প্রসঙ্গ জানউ কোউ কোউ॥ ( রাম চরিত মানস )
সুতরাং অযোধ্যাপুরী সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ইহা
সুস্পষ্ট ; পরন্তু
অযোধ্যাপুরী প্রভুর অচল বিগ্রহ যাঁহাকে কেহ কোথাও লইয়া যাইতে সক্ষম নহে। এই
নিমিত্ত ভক্তকেই শ্রীধামে গমন করিতে হয়। যুগে যুগে ভক্তগণই অযোধ্যাধামে গমন
পূর্ব্বক পরম ফলপ্রাপ্ত হইয়া থাকেন। আনুমানিক খৃষ্টীয় উনবিংশতি শতাব্দির প্রথম ভাগ
; কোন পর্ব্ব
উপলক্ষে পুণ্যার্থীগণের সমাগম হইয়াছে। উত্তর প্রদেশ সংলগ্ন বিহার প্রান্তের কোন এক
গ্রাম হইতে এক ব্রাহ্মণী তাঁহার পঞ্চম বর্ষীয় পুত্রকে লইয়া এই পরম ধামে
পুণ্যার্থীদের সহিত আগমন করিয়াছেন। সরযূ স্নান সমাপন পূর্ব্বক তাঁহারা ভগবান
শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহ দর্শন করিয়া এক সন্তের আশ্রমে উপনীত হইয়াছেন। পুণ্যার্থিগণ
তেজপুঞ্জ কলেবর সন্তগণকে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণাম পূর্ব্বক তাঁদের সাধ্যমত
সাধুসেবার নিমিত্ত অর্থ ও অন্যান্য দ্রব্যসম্ভার অর্পণ করিতেছেন। বালক সন্ত দর্শন
করিয়া মাতাকে জিজ্ঞাসা করিল—“মা, এই সাধুমহাত্মাগণ এত বড় কি প্রকারে হইয়াছেন, ইহাদের মা কোথায়, ইহাদের কে
খাইতে দেয়?” মাতা স্মিত
হাস্যে বলিলেন—“বাবা, ইহঁারা রাম
নাম জপ করিয়া এত বড় সাধু হইয়াছেন ; শ্রীরামচন্দ্র ইহঁাদের পিতা, শ্রীজানকী ইহঁাদের মাতা এবং ইহঁাদের পিতামাতা খাইতে দেন।” মাতার এই বাক্যে
বালকের মনে শ্রীরামচন্দ্র চরণে শরণাগতির যে দৃঢ় সঙ্কল্প জাগরিত হইল মাতা তাহা তখন
জানিতে পারিলেন না। কোন এক সময় জনতার ভীড়ে বালক মাতার হস্ত ছাড়িয়া জনতার মধ্যে
মিলাইয়া গেল। অনেক অনুসন্ধানেও বালকের কোন সন্ধান না পাইয়া ক্রন্দনরতা জননী
স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন করিলেন। প্রায় দুই তিন বৎসর পরে বালকের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়
সন্ধান পাইয়া বালককে বাটীতে লইয়া যাইলেন। যথাকালে নবম বৎসর বয়ঃক্রম কালে বালকের
উপনয়ন হইল কিন্তু বালক সর্ব্ব বিষয়ে উদাসীন ভাবে দিন যাপন করিতে লাগিল। ঐশী
নির্দ্দেশে দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রমকালে বালকের জন্মভূমি সমীপস্থ এক গ্রামে অকস্মাৎ এক
বিদ্যাবয়ীবৃদ্ধ ভ্রমণশীল ঋষিকল্প শ্রীশ্রীঅনন্তশ্রী বিভূষিত শ্রীস্বামী সীতারাম
দাসজী মহারাজ নামে এক সন্ত আগমন করিলেন। প্রভুর মঙ্গলময়ী প্রেরণা ও বিবেকাতীশর
নিমিত্ত এই দ্বাদশবর্ষ বয়ঃক্রম কালে দুর্জ্জয় গৃহ শৃঙ্খল ছিন্ন করত বালক এই
মহাত্মার সহিত মিলিত হইল। কিছুক্ষণের মধ্যে
পৃষ্ঠা ৩০
মহাত্মার সঙ্গ ও উপদেশে প্রভার্বিত হইয়া সহজাত
সংস্কার বশত বালকের মনে তীব্র বৈরাগ্য জাগ্রত হইল ও বালক সেই ক্ষণেই সেই
মহাপুরুষকে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য্য আশ্রমে দীক্ষা প্রদান করিয়া অনুগৃহীত করিতে অনেক
প্রকারে অনুনয় বিনয় করিতে লাগিল। উক্ত সন্ত ভগবান প্রথমে বহু শাস্ত্রীয় উপদেশ
দ্বারা পুনরায় গৃহে প্রত্যাবর্তন পূর্ব্বক ঈশ্বর আরাধনার উপদেশ প্রদান করিয়া
বলিলেন যে গার্হস্থ আশ্রমই কলিযুগে সরল ও শ্রেষ্ঠ পথ ; পরন্তু যাহার যে বস্তু প্রাপ্তির নিমিত্ত উৎকট
বাসনা জাগ্রত হয় সে এই বার্দ্ধ উপদেশে আপন স্থির লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হইবার চিত্ত
হৃদয়ে ধারণ করিবে কেন? সুতরাং বালক
স্বীয় দৃঢ় সঙ্কল্প হইতে বিচ্যুত না হইয়া পুনঃপুনঃ মহাত্মাকে অনুনয় বিনয় করিতে
লাগিল। মহাত্মা স্বীয় বিমল বিবেক ধুর বিষদ শ্রুতি অনুকুল তর্ক বিচার দ্বারা বালককে
নিরস্ত করিতে ত্রুটি করিলেন না। কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বালক মহাত্মাকে বলিল “আপনি
শরণাগতজনকে কৃপা করিয়া শিষ্যত্বে গ্রহণ করুন ; আমাকে এই মোহময় সংসারে প্রেরণ করিবেন না।” বালকের আকুল প্রার্থনায় বিবশ
হইয়া মহাত্মা বালককে সঙ্গে লইয়া প্রস্থান করিলেন। এই শুভ সংযোগ মুঙ্গের জিলার
জনপদে সংঘটিত হইয়াছিল। পদব্রজে ভ্রমণ করিতে করিতে মহাত্মা বালককে কিছুকাল
আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও কর্ম্মকাণ্ডের আচারাদির উপদেশ প্রদান পূর্ব্বক বালকের আচার
আচরণ আরও অধিক বিশুদ্ধ করিতে প্রয়াস করিতে লাগিলেন। কখন কখন বালকের মনে কোনরূপ
সংসার বাসনা আছে কিনা পরীক্ষা করিতে লাগিলেন যাহাতে বালককে স্বগৃহে ফিরাইয়া দিতে সক্ষম
হন। পরন্তু বিশুদ্ধ স্বর্ণ কষ্টি প্রস্তরে পরীক্ষা করিলে কখনও তাহার অশুদ্ধতা
নয়নগোচর হয় না। বালকের শুদ্ধ, ঋজু ও গম্ভীর মনোযোগ দেখিয়া মহাত্মা শালীগ্রামীর গঙ্গার তীরে এক উচ্চকোটি
সন্তের আশ্রমে আগমন করিলেন এবং এই আশ্রম পরম পবিত্র ও শুভ স্থান জানিয়া অগ্রহায়ণ মাসে, শুক্ল পক্ষে, সপ্তমী তিথির শুভ মুহূর্ত্তে বৈদিক বিধি অনুসারে পঞ্চ সংস্কার অর্থাৎ ললাটে
উর্দ্ধপুণ্ড্রতিলক, গলে তুলসীর
মালা, বাহুদ্বয়ে
ধনু, বাণ, শঙ্খচক্রাদির চিহ্ন, কর্ণে শ্রীরামধনকীর যুগল মন্ত্র এবং শ্রীভাগবত
সম্বন্ধীয় নাম করণ দ্বারা বালককে বৈরাগ্য আশ্রমে দীক্ষিত করত উহার নাম শ্রীবাসুদেব
দাস রাখিলেন। শাস্ত্রে পঞ্চ সংস্কার নিম্নলিখিত শ্লোকে বর্ণিত হইয়াছে :—
পুণ্ড্রং
মুদ্রা তথা নাম মালা মন্ত্রশ্চ পঞ্চমঃ ।
অমী হি
পঞ্চ সংস্কারাঃ পুণ্যৈকান্ত হেতবঃ ॥
এই প্রকারে নামকরণ করিয়া শ্রীরামানন্দীয় দীক্ষা
তথা বৈষ্ণবী শিক্ষা প্রদান করিলেন। বালক এই বাল্যবয়সেই দিব্যবেশ ধারণ করত দেবতুল্য
সুশোভিত
পৃষ্ঠা ৩১
হইতে লাগিলেন। তাঁহার গুরুদেব শিক্ষা প্রদানকালে
উপদেশ প্রদান করিলেন “অদ্য হইতে শ্রীরামজানকী তোমার পিতামাতা, পিতৃব্যগণ তোমার বন্ধুবর্গ, তুমি এইক্ষণ হইতে সূর্য্য বংশের—অযোধ্যা তোমার
জন্মভূমি ; তুমি অচ্যুত
গোত্রে গোত্রান্তরিত হইয়াছ এবং তোমার সকল সম্বন্ধই একমাত্র শ্রীরামজীর সহিত, অন্য কাহারো সহিত নহে জানিও।”
এই বালকই উত্তর কালে আমাদের পরম পূজ্য গুরুদেব
শ্রীশ্রীঅনন্ত শ্রীবিভূষিত স্বামী বাসুদেবদাসজী ত্যাগী মহারাজ।
শ্রীমহারাজজী দ্বাদশবর্ষে স্বীয় গুরুদেবের
উপরোক্ত উপদেশ এরূপ হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন যে কখনও তাঁহার মুখারবিন্দ হইতে তাঁহার
বৈরাগ্য আশ্রমের পূর্ব্বের সংসার আশ্রম সম্বন্ধীয় কোনও বাক্যও শ্রুতিগোচর হয় নাই।
যদি কোন সাধু তাঁহার সম্মুখে স্বীয় জন্মভূমির আলোচনা করিতেন, শ্রীমহারাজজী তাঁহাকে বলিতেন “এখনও আপনার
পরাবৈরাগ্য পূর্ণরূপে হয় নাই ; কিছু ভেদ রহিয়াছে।”
বালক শিষ্যের সারস্বত শিক্ষার নিমিত্ত
শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজের প্রখর দৃষ্টি ছিল। তিনি স্বয়ং বালককে অধ্যাপনা
করিতে লাগিলেন এবং এই বিষয়ে তাঁহার অতি কঠোরতা দেখা যাইত। সন্ধ্যার পরে যাহাতে
বালক নিদ্রিত হইয়া না পড়ে তজ্জন্য বালকের মস্তকের জটা আম্রবৃক্ষের শাখায় বাঁধিয়া দিতেন।
এইরূপ কঠোরতার সহিত বালক শিষ্যের সারস্বত শিক্ষা চলিতে থাকিল। এইরূপে প্রায় পাঁচ
বৎসর অতিবাহিত হইলে বালক শিষ্যের আত্যন্তিক নিষ্ঠা, তিতিক্ষা, বৈরাগ্য, গুরুভক্তিতে বাহ্যিক কঠোর স্বামী সীতারামদাসজী
তাঁহার প্রতি অতিশয় স্নেহবশত বিচার করিলেন যে পুরপ্রতীম শিষ্য অত্যন্ত প্রতিভাশালী
এবং ভবিষ্যতে ইহাকে লোক কল্যাণ নিমিত্ত আবির্ভূত হইতে হইবে। ইহার শাস্ত্রোক্ত
অষ্টাঙ্গযোগ, হঠযোগ, রাজযোগ এবং ইহার সহিত সাম্প্রদায়িক সন্তগণের
আচার নিয়ম ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের শিক্ষা আবশ্যক। সুতরাং ইহাকে কিছুকাল শ্রেষ্ঠ
সন্তগণের সান্নিধ্যে রাখা একান্ত কৰ্ত্তব্য যাহাতে বালকের উপর ভারতের সন্তগণের
প্রভাব পতিত হয় এবং বালক সকল যোগশাস্ত্রে পারঙ্গম হইয়া উত্তরকালে লোকগুরু রূপে
আত্মপ্রকাশ করে। শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ স্বয়ং এক উচ্চকোটি সন্ত ছিলেন এবং তিনি
সন্ত প্রভাব মানবের জীবনে কিরূপ সুদূর প্রসারী, দিব্য ও অলৌকিক হয় বিলক্ষণ জানিতেন। ভক্তমালের অমর স্রষ্টা শ্রীনাভাজী
মহারাজের গুরুদেব শ্রীস্বামী অগ্রদেবদাসজী নাভাজীকে বৈষ্ণবীয় পঞ্চসংস্কার দীক্ষা
প্রদান করিয়া সন্ত প্রসাদ গ্রহণ ও সন্ত সেবার নিমিত্ত সন্তগণের সান্নিধ্যে
রাখিয়াছিলেন। এই সন্ত প্রভাব ও প্রসাদে শ্রীনাভাজীর অচিরাৎ দিব্য নয়ন প্রস্ফুটিত
হইয়াছিল। যথা ভক্তমালে :—
পৃষ্ঠা ৩২
অচরজ
দয়ো নয়ো যহা লৌ প্রবেশ ভয়ো,
মন সুখ
ছয়ো, জান্যো সন্তন প্রভাব কো ।
আজ্ঞা তব
দই ”য়হ ভই তোপৈ সাধু কৃপা,
উহীকো
রূপ গুণ কহৌ হিয়ে ভাব কো ॥
বল্যো
করজোরি, যাকো পাবত ন ওর ছোর,
গাউঁ
রামকৃষ্ণ নহী পাউঁ ভক্তি দাব কো ।
কহীসমুঝাই, বোঝি হৃদয় আই কহে সব,
জিন লৈ
দিখাই দঈ সাগর মে নাব কো ॥
কোনও এক সময়ে শ্রীগুরু অগ্রদেবদাসজী ধ্যানমগ্ন
হইয়া শ্রীরামচন্দ্রের মানসী সেবা সংলগ্ন ছিলেন এবং শিষ্য নাভাজী অতি সতর্কতার সহিত
ময়ূর ভঞ্জন দ্বারা ব্যজন করিতেছিলেন। সেই সময়ে শ্রীঅগ্রদেবদাসজীর এক বণিক শিষ্য
প্রান্তর লইয়া জাহাজ যোগে বাণিজ্য নিমিত্ত সমুদ্র যাত্রায় গমন করিলে জাহাজ সঙ্কটে
পতিত হইয়াছিল। এই সঙ্কটে জাহাজ সহিত উক্ত বণিক স্বীয় গুরু মহারাজকে স্মরণ পূর্ব্বক
প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। ইহাতে শ্রীমৎকেবলীর ধ্যান শ্রীভগবানের মনোরম মানসী সেবা
হইতে বিচ্যুত হইলে শ্রীনাভাজী শ্রীগুরু মহারাজের ধ্যান বিঘ্ন হৃদরঙ্গম করিয়া
হস্তস্থিত ব্যজন দ্বারা জাহাজকে সঙ্কট হইতে রক্ষা করিয়া শ্রীগুরু অগ্রদেবদাসজীকে
বিশদ ভাবে নিবেদন করিলেন—“প্রভু! জাহাজ নিরাপদে বহু দূর চলিয়া গিয়াছে আপনি পরম
মাধুর্য্যময় প্রভুর ধ্যানে নিমগ্ন হউন।” ইহা শ্রবণ করিয়া শ্রীঅগ্রদেবদাসজী নয়ন
উন্মীলন পূর্ব্বক শ্রীনাভাজীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন—“এরূপ বাক্য কে বলিল?” শ্রীনাভাজী করজোড়ে বলিলেন—“প্রভো, যাহাকে আপনি শিশুকাল হইতে আপনার ভক্ত প্রসাদ
দ্বারা পালন করিয়াছেন সেই আপনার কিঙ্কর এই প্রকার নিবেদন করিয়াছে।” শ্রীনাভাজীর
অলৌকিক বাক্য শ্রবণে শ্রীঅগ্রদেবদাসজী মহামহোপাধ্যায়ান্বিত হইয়া মনে বিচার করিতে
লাগিলেন যে শিষ্য নাভা আমার হৃদয়ে মানসী সেবা কি প্রকারে দর্শন করিতে সক্ষম হইল
এবং কি প্রকার এই স্থানে অবস্থান করিয়া জাহাজ সঙ্কট হইতে রক্ষা করিল। ইহা বিচার
করিয়া তাঁহার মনে অত্যন্ত প্রসন্নতার উদয় হইল ; তিনি জানিতে পারিলেন যে ইহা সন্তগণের সেবা ও তাঁহাদের প্রসাদের প্রভাবে
হইয়াছে এবং তাহাদের প্রসাদ প্রসঙ্গেরই শিষ্য নাভার দিব্য দৃষ্টি হইয়াছে। তখন
অগ্রদেবদাসজী নাভাজীকে বলিলেন—“তোমার উপর সন্তগণের কৃপা হইয়াছে অতএব তুমি সেই সাধু
সন্তগণের গুণ, স্বরূপ ও
হৃদয়ের ভাব বর্ণনা কর।” শ্রীগুরু মহারাজের এই আজ্ঞা শ্রবণ করিয়া শ্রীনাভাজী করজোড়ে
বলিলেন—“ভগবন্! আমি শ্রীরাম ও শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণের চরিত কিছু বর্ণনা
পৃষ্ঠা ৩৩
করিতে সমর্থ পরন্তু সন্তগণের চরিত্রের কোন আদি
অন্ত পাইতেছি না কারণ তাঁহাদের রহস্য অতিশয় গভীর, আমি ভক্তের ভক্তি রহস্য বর্ণনা করিতে অসমর্থ।” ইহা শ্রবণ করিয়া
শ্রীঅগ্রদেবদাসজী বলিলেন—“যাঁহাদের কৃপাপ্রভাবে তুমি আমার মানসীসেবা দর্শন করিয়াছ
ও এই স্থানে অবস্থান করিয়াও সাগরে জাহাজ রক্ষা করিয়াছ সেই ভক্ত সন্তগণই তোমার হৃদয়ে
অবস্থান করিয়া সকল রহস্য ও তাঁহাদের স্বরূপ প্রদর্শন করাইবেন।” যথা : “সতো
দিশান্তি চক্ষুষি”। শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজ শ্রীস্বামী অগ্রদেবদাসজী
মহারাজ সদৃশ প্রিয় পুত্রপ্রতীম শিষ্য কিশোর শ্রীবাসুদেবদাসজীকে ভক্ত সন্তগণের
সান্নিধ্যে রাখিতে মনস্থ করিলেন।
॥ কুদরহা আশ্রমে যোগশিক্ষা ও অবস্থান ॥
উত্তর প্রদেশান্তর্গত বস্তি জিল্যায় কুদরহা নামে এক প্রসিদ্ধ আশ্রম ছিল এবং তথায় যোগীরাজ শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজ অবস্থান করিতেন। তিনি শুধুমাত্র যোগীশ্রেষ্ঠ ছিলেন না, তাঁহার তুল্য মন্ত্ররহস্য ও কর্মকাণ্ডবিদ উচ্চকোটি সন্ত তৎকালীন ভারতবর্ষে কমই ছিল। এই কারণে ভারতের সর্ব প্রান্ত হইতে সাধক সন্তগণ তথায় আগমন করত তাঁহার চরণচ্ছায়ায় যোগশিক্ষা করিতেন। সুতরাং কুদরহা আশ্রমে অনেক সদাচারী শ্রেষ্ঠ সন্ত অবস্থান করিতেন ও ইহা ভিন্ন সন্তগণের গমনাগমন নিত্যই লাগিয়া থাকিত। শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজ কিশোর শিষ্যকে সঙ্গে লইয়া শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজের সান্নিধ্যে রাখিলেন। আশ্রম প্রাচীন ঋষিগণের আশ্রম সদৃশ রমণীয় ছিল। কিশোর শিষ্যকে শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজের তত্ত্বাবধানে ও অন্যান্য সন্তগণের সান্নিধ্যে রাখিয়া শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজ তীর্থ পর্যটনে গমন করিলেন। স্থানের রমণীয়তা ও বহু শ্রেষ্ঠ সন্তের অবস্থিতি হেতু কিশোর শিষ্যের মন এই আশ্রমের প্রতি স্বভাবতই আকৃষ্ট হইল। তিনি যথারীতি যোগীরাজ শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজের সেবায় আত্মনিয়োগ করিলেন। প্রতিদিন রাত্রি ২ ঘটিকায় নিদ্রাত্যাগ পূর্বক শৌচাদি ক্রিয়া সমাপন করিয়া যোগীগুরুদেব শ্রীপ্রয়াগদাসজীর স্নানের জল, দন্তকাষ্ঠ, শুদ্ধ কৌপীন ও উত্তরীয় সংগ্রহ করত প্রতীক্ষা করিতেন। যোগীরাজ রাত্রি তিন ঘটিকায় স্নান সমাপন করিলে গোমাতার সেবায় যাইতেন, পশ্চাৎ তিনি পুনরায় যোগীরাজের সেবায় নিরত থাকিতেন। এই সকল সেবার মধ্যেও কিশোর শিষ্য স্বীয় সাধন অতি নিষ্ঠা, নিয়ম পূর্বক করিতে লাগিলেন। কিশোর শিষ্যের আন্তরিক সেবা, কঠোর ত্যাগ, তিতিক্ষা, সদাচার সম্পন্ন আচরণ, সাধন নিষ্ঠা, স্বাভাবিক গাম্ভীর্যে যোগীরাজ অতি প্রসন্ন হইলেন; তিনি তাঁহাকে পুত্ৰাধিক স্নেহ করিতে লাগিলেন
পৃষ্ঠা ৩৪
এবং স্নেহবশত তাঁহাকে “লাল” বলিয়া সম্বোধন করিতেন। যোগীরাজ শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী তাঁহাকে দ্বাদশ বৎসর নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য্য ব্রত প্রদান পূর্বক সকল যোগ রহস্য, মন্ত্র রহস্য, বিধি নিষেধময় কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য নিগূঢ় তত্ত্ব উপদেশ করিতে লাগিলেন এবং শ্রীমহারাজজীও অতি নিষ্ঠার সহিত উহা শিক্ষা করিতে লাগিলেন; তিনি অতি অল্প সময় মধ্যে সকলই আয়ত্ত করিলেন। শিষ্যের অমানুষিক প্রতিভা ও সেবায় যোগীরাজ এরূপ প্রসন্ন ছিলেন যে শ্রীমহারাজজীকে তাঁহার অদেয় কিছুই ছিল না। শ্রীমহারাজজী কিছু প্রার্থনা করিলে অতি প্রসন্নতার সহিত তাহা তৎক্ষণাৎ পূর্ণ করিতেন। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে গ্রীষ্মের আধিক্য এরূপ প্রচণ্ড হয় যে দিবাভাগে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হইয়া যায়। সেবার গ্রীষ্মের এরূপ আধিক্য হইয়াছে যে কৃষিক্ষেত্র বিদীর্ণ হইয়া গিয়াছে, শস্য জ্বালিয়া গিয়াছে, এমন কি পক্ষীকুল বৃক্ষশাখা হইতে মৃত হইয়া ভূপাতিত হইতেছে; প্রাণীগণ ত্রাহি ত্রাহি রব তুলিতেছে। গ্রীষ্মের অতি আধিক্য দেখিয়া শ্রীমহারাজজী কৃতাঞ্জলী হইয়া যোগীগুরুদেব শ্রীশ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজীকে বিনম্রভাবে নিবেদন করিলেন—“মহারাজ! এই প্রচণ্ড তাপে প্রাণীগণ অস্থির হইয়াছে, অনেকেই মৃত্যুবরণ করিতেছে, ক্ষেত্রে শস্য জ্বালিয়া গিয়াছে এমনকি পক্ষীকুলেরও মৃত্যু হইতেছে। আপনি কৃপা করিয়া প্রাণীগণকে রক্ষা করুন।” যোগীরাজ মহারাজজীর প্রাণীগণের ক্লেশ নিবারণের নিমিত্ত সপ্রেম প্রার্থনায় অতি প্রসন্ন হইয়া বলিলেন—“বৎস! তুমি শালগ্রাম দেবকে সিংহাসন হইতে নামাইয়া একটি তাম্রপাত্রে স্থাপন পূর্বক তাঁহার মস্তকোপরি জলের ধারা স্থাপন করিয়া তাঁহাকে শুদ্ধ বস্ত্র দ্বারা আবৃত কর, অচিরাৎ বর্ষণ হইয়া ধরণী শীতল হইবে।” শ্রীমহারাজজী গুরুদেবের নির্দেশ পালন করিবার একঘণ্টা কাল পরে সমগ্র আকাশ কৃষ্ণবর্ণ মেঘে আবৃত হইল এবং প্রচণ্ড বারিপাত হইতে লাগিল। কিছুক্ষণ মধ্যে পৃথিবী শীতল হইলে প্রাণীগণের ক্লেশের উপশম হইল। অনুরূপ প্রার্থনা পূরণ যোগীরাজ অনেক বারই করিয়াছেন। এই সকল ঘটনার উল্লেখ করত শ্রীমহারাজজী উত্তরকালে শিষ্যগণকে বলিতেন তোমাদের শ্রীলালসাহেব ( শ্রীরাম চন্দ্রের বালকমূর্ত্তি ) ভগবানের বিগ্রহের মহিমা সম্বন্ধে ধারণা নাই, শ্রীলাল সাহেব ভগবানের মহিমা অপার। এই প্রসঙ্গে স্বীয় গুরুদেব শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ ও শ্রীপ্রয়াগদাসজী মহারাজের তাঁহার প্রতি স্নেহ ও প্রীতির কথা বলিতে বলিতে তাঁহার বাকরোধ হইয়া যাইত এবং নয়নদ্বয় হইতে অবিরাম প্রেমাশ্রু পাত হইত। তাঁহার এই প্রকার গুরুভক্তি দেখিয়া শিষ্যগণ স্তম্ভিত হইয়া চিন্তা করিত আমরা যেন এই প্রকারে শ্রীমহারাজজীকে ভালবাসিয়া জীবন ধন্য করিতে পারি।
নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য্য ব্রতে দীক্ষিত হইয়া নিয়মানুসারে শ্রীমহারাজজী যোগীরাজের
পৃষ্ঠা ৩৫
নির্দেশমত বৃক্ষমূল অথবা উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করিতেন। কুদরহা আশ্রমে অবস্থান কালে সন্ত সেবা ও শ্রীগুরুসেবার মধ্যে শ্রীমহারাজজী সম্প্রদায়িক গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন পূর্বক অধিসত করিলেন এবং যোগীরাজ হইতে সমুদায় যোগশাস্ত্রে ও কর্মকাণ্ডে অতিশয় পারঙ্গম হইলেন। অতি অল্পকাল মধ্যে বিশুদ্ধ আধার শ্রীমহারাজজীর পরাম বৈরাগ্য ও অমানুষিক প্রতিভা, সংযম, সাধনা নিষ্ঠা, উৎকাট তপস্যা, স্বভাবগাম্ভীর্য্য, মধুর মিতবাক্ অসামান্য গুরু ভক্তি ও সন্তসেবা দর্শনে সন্তগণ অচিরাৎ তাঁহার প্রতি প্রেমমুগ্ধ হইলেন। সকল সন্তের প্রেম ও কৃপা শ্রীমহারাজজীর উপর অধিকতর ভাবে বর্ষিত হইতে লাগিল। অধিকন্তু শ্রীযোগীরাজের বরদ করকমলছায়া নিরন্তনন্তর শ্রীমহারাজজীর মস্তকোপরি প্রসারিত ছিল। তিনি অতিশয় স্নেহে শ্রীমহারাজজীকে সকল মন্ত্র রহস্য উপদেশ করিতে লাগিলেন। ইতিপূর্বে শ্রীমহারাজজীকে পরম দয়াল গুরুদেব শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ কিছুকাল এই আশ্রমে অবস্থান করত সাধনা করিতে উপদেশ প্রদান পূর্বক তীর্থ পর্যটন নিমিত্ত প্রস্থান করিয়াছিলেন। তিনি মধ্যে মধ্যে আবির্ভূত হইয়া শিষ্যকে সাধনে উৎসাহ ও আনন্দ দান করিয়া পুনরায় তীর্থ ভ্রমণে চলিয়া যাইতেন; শিষ্যের প্রতি সন্তগণের অবিরাম কৃপা দর্শন করিয়া শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। শ্রীমহারাজজী কুদরহা আশ্রমে যোগীরাজ শ্রীশ্রীপ্রয়াগদাসজী ও অন্যান্য বিশুদ্ধ সন্তগণ সান্নিধ্যে প্রায় ছয় বৎসর কাল অতিবাহিত করিয়া স্বীয় সাধনের বিকাশ করিলেন।
॥ অযোধ্যাপুরীতে আগমন ॥
প্রভুর অপর সাকেত পুরী অযোধ্যা বস্তিজেলার কুদরহা আশ্রম হইতে অধিক দূরবর্তী না হওয়ায় কুদরহা আশ্রমে অযোধ্যা হইতে সন্তগণের আগমন প্রায়শই লাগিয়া থাকিত। সেই সকল সমাগত সন্তগণ অযোধ্যাপুরীর মহোৎসব ও রমনীয়তার আলোচনা করিতেন। এই নিমিত্ত একদা শ্রীমহারাজ জীর মনে স্বীয় উপাস্যদেবের পবিত্র স্থান দর্শন করিতে অভিলাষ জন্মিল। শ্রীহরির ইচ্ছায় গুরুদেব শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ সেই সময়ে কুদরহা আশ্রমে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং শ্রীমহারাজজী অযোধ্যা গমনের ইচ্ছা তাঁহার চরণে নিবেদন করিলেন। তিনি প্রসন্নতা সহকারে শ্রীমহারাজজীকে সঙ্গে লইয়া অযোধ্যাপুরীতে আগমন করত শ্রীরাজগোপাল মন্দিরে তাঁহার অবস্থানের সুব্যবস্থা করিয়া স্বয়ং তীর্থ পর্যটনের নিমিত্ত গমন করিলেন। কিন্তু সময়ে সময়ে শিষ্যের সংবাদ লইতে যে প্রকারে কুদরহা আশ্রমে আসিতেন সেই প্রকার অযোধ্যাপুরীতে আসিয়া শিষ্যকে দর্শন দান করিতে লাগিলেন।
পৃষ্ঠা ৩৬
শ্রীমহারাজজী অযোধ্যাপুরীতে অবস্থান পূর্বক শ্রীবলরামাচাৰ্য্যজী মহারাজের নিকটে শ্রীমদ্ভগবত গীতা এবং মধুকরী কুঞ্জের মধুকরিয়া বাবার নিকট শ্রীনাভাজী কৃত ভক্তমাল অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। অধ্যয়ন কালে একবার মাত্র শ্রুত বিষয় তাঁহার স্মৃতিতে জাগরূক থাকিত এবং তিনি কখনও তাহা বিস্মৃত হইতেন না। ইহা শ্রীমহারাজজীর এক বৈশিষ্ট্য ছিল। উক্ত গ্রন্থ দুইটিই অধ্যয়ন অতি অল্পকাল মধ্যেই সমাপ্ত হইল।
॥ শ্রীকাশীপুরী আগমন ॥
অযোধ্যা ধামে প্রায় আড়াই বৎসর কাল বাস করিয়া শ্রীমহারাজজী ভগবান শ্রীবিশ্বনাথ দর্শন নিমিত্ত কাশীধামে আগমন করিলেন। প্রথমে তিনি কাশীর গঞ্জ মহল্লায় অবস্থিত শ্রীরাম মন্দিরে উপস্থিত হইলে মন্দিরের শ্রীমহান্তজী শ্রীখুবদাসজী তাঁহাকে অতি প্রেমের সহিত গ্রহণ করিলেন। শ্রীখুবদাসজী কুদরহা আশ্রমে শ্রীমহারাজের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। শ্রীমহারাজজী এই নির্জন স্থানে প্রায় দশ বৎসর কাল অবস্থান করেন এবং এই স্থানেই তিনি সাধনের গভীরে প্রবেশ করেন। ইহা ভিন্ন শ্রীমহারাজজীর তৎকালীন অন্য কোন ঘটনাবলী আজও অজ্ঞাত রহিয়াছে। প্রভুর প্রেরণায় অকস্মাৎ শ্রীমহারাজজীর মনে গোস্বামী তুলসীদাসের রামচরিত মানস ও অন্যান্য গ্রন্থাবলী অধ্যয়ন ও সাধনের ইচ্ছা জাগ্রত হইল।
কাশীর উত্তর প্রান্তে বরুণা নদীতীরে বেদান্তীবাগ নামে এক বিখ্যাত স্থানে শ্রীরামায়ণী স্বামী মাধবদাসজী মহারাজ সমীপে গোস্বামী তুলসীদাসের সাহিত্যাবলী অধ্যয়ন নিমিত্ত আগমন পূর্বক স্বীয় ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন এবং তিনি হর্ষ সহকারে শ্রীমহারাজজীকে তাঁহার নিকট নিবাস করিতে অনুমতি প্রদান পূর্বক বলিলেন—“এই স্থানে আহারের কোন ব্যবস্থা নাই, তোমাকে ভিক্ষার দ্বারা আহার সংস্থান করিতে হইবে।” শ্রীমহারাজজী বলিলেন—“আমি ভিক্ষায় অনভিজ্ঞ সুতরাং কি প্রকারে ভিক্ষা করিতে হয় জ্ঞাত নহি।” শ্রীমাধবদাসজী বলিলেন—“তিন প্রকার ভিক্ষার উপায় বর্তমান ; প্রথম, কোন ছত্রে গমন করিয়া ভোজন; দ্বিতীয়, কোন গৃহস্থবাটিতে পলান্ন ভিক্ষা, তৃতীয়, গৃহস্থের নিকট আটা অথবা চাউল ভিক্ষা করত স্বপাকে ভোজন।” শ্রীমহারাজজী বলিলেন—“আমি ভিক্ষার তৃতীয় উপায় দ্বারাই আমার আহার সংগ্রহ করিতে ইচ্ছা করি, পরন্তু আমি গৃহস্থগণের আবাস স্থল সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ।” শ্রীমাধবদাসজী বলিলেন—“এই স্থানের সাধুর সহিত ধার্মিক গৃহস্থবাটিতে চাউল অথবা আটা ভিক্ষা করিও।” পরদিবস হইতে শ্রীমহারাজজী শ্রীসরযূশরণ দাস নামে আশ্রমের এক সাধুর সহিত ধার্মিক
পৃষ্ঠা ৩৭
গৃহস্থবাটিতে ভিক্ষার নিমিত্ত “সীতারাম” বলিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। গৃহকর্ত্রী সাধু দর্শন করিয়া উভয়কেই প্রয়োজন মত আটা ভিক্ষা প্রদান করিলেন। পরদিবস হইতে শ্রীমহারাজজী একাকী ভিক্ষায় গমন করিয়া অন্য এক গৃহস্থের বাটিতে “সীতারাম” বলিয়া দণ্ডায়মান হইলে গৃহকর্তা তেজপুঞ্জ সমন্বিত তপোমায় মূর্তি দর্শন করিয়া প্রচুর আটা ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য ভিক্ষা প্রদান করিয়া পুনরায় তাঁহাকে ভিক্ষার্থে আগমন করিতে অনুরোধ করিলেন। কিন্তু শ্রীমহারাজজী যাহাতে সেই গৃহস্থের আশ্রম পীড়া উপস্থিত না হয় তজ্জন্য সেই গৃহস্থের বাটিতে গমন না করিয়া অন্য গৃহস্থের বাটিতে গিয়া দণ্ডায়মান হইলে গৃহস্থ তাঁহার প্রয়োজন অতিরিক্ত আটা প্রদান করিলেন। প্রতিদিনই গৃহস্থ তাঁহাকে অধিক পরিমাণ ভিক্ষা প্রদান করিতে লাগিলেন এবং তাঁহারা সপ্রেমে তাঁহাকে পুনরায় ভিক্ষা নিমিত্ত আসিতে অনুরোধ করিতে লাগিলেন। শ্রীমহারাজ উদ্বৃত্ত খাদ্যসামগ্রী বেদান্তীবাগে সমাগত সাধুগণকে প্রদান করিতে লাগিলেন। এতে আশ্রমস্থ সাধুগণ শ্রীমহারাজজীর প্রতি প্রেম পোষণ করিতে লাগিলেন। এই প্রকারে শ্রীমহারাজজী ক্ষুদ্রভাবে বেদান্তীবাগ আশ্রমেই সাধুসেবা প্রবর্তন করিলেন।
শ্রীমাধবদাসজী মহারাজ তৎকালে ভারতের এক শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, বক্তা ও রামায়ণিবিদ ছিলেন এবং এই নিমিত্ত বহুদূরবর্তী স্থান হইতে বিদ্যার্থিগণ তাঁহার নিকট আগমন করিতেন। পরন্তু শ্রীরামায়ণীজী মহারাজ কর্মকাণ্ডের অতি অনুরাগী হওয়ায় সম্পূর্ণ দিবস পূজা, পাঠ, ও ভজন-ধ্যানেই অতিবাহিত করিতেন। রামায়ণী কথা রাত্রি দশ ঘটিকার পরে হইত। শ্রীরামায়ণী মহারাজের বাচনশৈলী এরূপ সুন্দর ছিল যে অধ্যাপনার সময়ে শ্রুত বিষয়গুলি শ্রোতাগণের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করিত এবং তাঁহারা সহজে বিস্মৃত হইতেন না। এই নিমিত্ত শ্রোতামণ্ডলী তাঁহার জ্ঞান গরিয়ায় এরূপ প্রভাবিত হইতেন যে প্রতিদিন রাত্রি দ্বিপ্রহর বা তাহার পরে আলস্য রহিত হইয়া তাঁহার বচন শ্রবণ করিতেন। শ্রীরামায়ণী মহারাজেত কৃপা যদিও সকল শিক্ষার্থীর উপর সমভাবে বর্ষিত হইত পরন্তু তিনি শ্রীমহারাজ জীর বৌদ্ধিক প্রতিভা, তীব্র বৈরাগ ও বিবেক-বিচারপূর্ণ আচরণে তাঁহার প্রতি অতি প্রসন্ন ছিলেন। সুতরাং শ্রীমহারাজ জী অল্পকাল মধ্যে গোস্বামীজীকৃত সকল গ্রন্থের জ্ঞান অতি সহজেই সম্যকরূপে উপলব্ধি করিলেন এবং তিনি এরূপ ভাবে উহা ব্যাখ্যা করিতেন তাতে মনে হইত তিনি ঐ সকল গ্রন্থ পূর্ব বহুবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করিয়াছেন। শ্রীরামায়ণীজী মহারাজ দিবাভাগেশুধুমাত্র নাম জপে মগ্ন থাকিতেন এবং এই সময়ে কোন ব্যক্তি রামায়ণী কথা অতি ব্যগ্রভাবে প্রার্থনা করিলে তিনি স্বয়ং উহা না করিয়া শ্রীমহারাজজীকে রামায়ণী কথা শ্রবণ করাইতে আজ্ঞা প্রদান করিতেন।
পৃষ্ঠা ৩৮
শ্রীমহারাজজী স্বীয় ললিত বাণীদ্বারা ভগবত যশ বিস্তার পূর্বক বর্ণন করিয়া সমবেত শ্রোতামণ্ডলীকে ভাব বিভোর করিতেন। তাঁহার বচনাবলী শ্রবণ করিয়া শ্রীরামায়ণী মহারাজও অতি প্রসন্ন হইতেন। এই প্রকারে শ্রীমহারাজজী রামায়ণী কথা বর্ণন করিবার অধিক সুযোগ পাইতে লাগিলেন এবং তাঁহার সংসঙ্গ দ্বারা সুখ অনুভব করিবার নিমিত্ত অনেক কাশীবাসি তাঁহার ভক্ত ও অনুরাগী হইলেন।
॥ সাধু সেবা ভক্তির অঙ্গ ॥
শ্রীমহারাজজী সাধুসেবা ভক্তির প্রধান অঙ্গ বলিয়া নির্দেশ করিতেন এবং ইহার উদাহরণে অধিকতর রূপে শ্রীনাভাজীকৃত “ভক্তমালের” তৃতীয় কবিত্যের উল্লেখ করিতেন। এই কবিত্যে ভক্তিমহারাণীকে এক নারীর শৃঙ্গার রূপক হিসাবে প্রয়োগ করা হইয়াছে। এই শৃঙ্গারে সাধুসেবাকে কর্ণফুল বা কর্ণভূষণ বলা হইয়াছে, কারণ কর্ণভূষণ সধবা নারীর প্রধান চিহ্ন। বিধবা নারীর কর্ণভূষণ ধারণ নিষিদ্ধ। সধবানারীরই সন্তানরূপ ফল প্রাপ্ত হইয়া থাকে, অসধবা নহে। সেই প্রকার যাহার ভক্তিতে সাধুসেবাই প্রধান সেই ভগবানের প্রসন্নতারূপফল প্রাপ্ত হইতে সক্ষম হয়। সাধুসেবা বিহীন ভক্তি নিষ্ফল হইয়া থাকে। যথা কবিত্ত ৩ ঃ—
শ্রদ্ধাই ফুলেল ও উবটনো শ্রবণ কথা,
মৈল অভিমান অঙ্গ অঙ্গনি ছুটাইয়ে।
মনন সুনীর অহবায় অঙ্গছায় দয়া,
নবনি বসন পণ সোঁয়ৌ লৈ লাগাইয়ে ॥
আভরণ নাম হরি সাধু সেবা কর্ণফুল।
মানসী সুনথ সঙ্গ অঞ্জন বানাইয়ে।
ভক্তি মহারাণী কো সিঙ্গারু চারু বীতি চাহ,
বহৈ জো নিহারি লহৈ লাল পয়ারী গাইয়ে ॥
শ্রীমহারাজজী যখন এই কবিত্যের তাৎপর্য বিশদ ভাবে স্বীয় অনুপম মধুর বাক্ শৈলী দ্বারা বর্ণন করিতেন, শ্রোতামণ্ডলী বাহ্যজ্ঞান শূণ্য হইয়া মধুকর সদৃশ উহা পান করিতেন। বিশদ ব্যাখ্যা এই গ্রন্থের যথাস্থানে সন্নিবেশিত হইয়াছে।
॥ সন্ত সঙ্গ ( সৎ সঙ্গ ) তীর্থ হইতে শ্রেষ্ঠ ॥
শ্রীমহারাজজী বিশেষরূপে সন্তসঙ্গকে তীর্থ হইতে শ্রেষ্ঠ বলিতেন। তিনি বলিতেন যে তীর্থের দর্শন, স্পর্শন, মজ্জ্ন ও পানের ফল যথাকালে লাভ হয়
পৃষ্ঠা ৩৯
কিন্তু সন্তের দর্শন, স্পর্শন, বার্ত্তালাপ ও সেবনের ফল সদাই লাভ হইয়া থাকে। প্রমাণ স্বরূপ তিনি নিম্নলিখিত শ্লোক উল্লেখ করিতেন ঃ
সাধুনাং দর্শনং পুণ্যং তীর্থভূতাহহি সাধবঃ।
কালেন ফলতে তীর্থ সদ্যঃ সাধু সমাগমঃ॥
সাধুনাং দর্শনং পুণ্যং স্পর্শনম পাপনাশনম্।
সম্ভাষণং মহাপুণ্যং সেবনং পরমং পদম্ ॥
॥ সন্তের প্রতি স্নেহ ॥
বেদান্তীবাগের শ্রীরামায়ণীজী মহারাজ অতি প্রাচীন হইয়াছেন অতএব রামায়ণের পঠন-পাঠন ব্যাখ্যাদি কার্যভার শ্রীমহারাজ জীর উপর সম্পূর্ণরুপে ন্যস্ত হইল এবং তিনি সেই কার্য্য অতি সুচারুরূপে সম্পাদন করিতে লাগিলেন। অকস্মাৎ শ্রীরামায়ণীজী মহারাজ ৮২ বৎসর বয়সে সাকেতধামে গমন করিলেন। তাঁহার অন্তিমসংস্কার কালে তাঁহার বহু শিষ্য ও ভক্ত আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা শ্রীমহারাজজীকে শ্রীরামায়ণীজী মহারাজের প্রতিমূর্তি জ্ঞানে শ্রীমহারাজজীর উপর সেই স্থানের পরম্পরা ও রামায়ণ পঠন-পাঠনের ঐতিহ্য ন্যস্ত করিলেন। সেই সময়ে সাধু সেবা ও রামচরিতমানস অনুষ্ঠান পারায়ণ এবং নিবিড় যোগ সাধনায় শ্রীমহারাজজীর সময় অতিবাহিত হইত ; ফলে তাঁহার বৈরাগ্য ত্যাগ প্রতিদিন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছিল। সন্তগণ ও বিদ্বজ্জন মধ্যে শ্রীমহারাজজীর যশ পরিব্যাপ্ত হইতে লাগিল।
লীলাময় প্রভুর লীলাসদৃশ প্রভুর ভক্ত সন্তগণের লীলাও বিশেষ বিলক্ষণ ও বিমুগ্ধকারী হইয়া থাকে। প্রভুর যশগাথার বিস্তার তাঁহার ভক্ত ভিন্ন কিরূপে সম্ভব? সন্তসদ্গুরুর লীলা অতি বিচিত্র, ইনি বিধাতার বিধাতা—ঈশ্বরের ঈশ্বর। সকল দৈবীগুণের সমাবেশ হইতেই দৃশ্য হয়, ইহার মহিমা শেষ, সারদা, গণেশও বর্ণন করিতে অসমর্থ। স্বয়ং ঈশ্বরও ভক্তের চরণরজের নিমিত্ত উদগ্রীব ; শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রী ভগবান বলিতেছেন ঃ—
নিরপেক্ষং মুনিং শান্তং নির্বৈরং সমদর্শনম্।
অনুব্রজাম্যহম্ নিত্যং পুজোয়্যঙ্ঘ্রি রেণুভিঃ॥
অতএব যতই ইহার লীলার পরিজ্ঞান, প্রচার হউক না কেন তাহাতে নূনতা থাকিবেই। শ্রীমহারাজজী সর্বগুণসম্পন্ন হইয়াও সাধুসেবা ও নিয়ম অনুষ্ঠানের উপর বিশেষ লক্ষ্য রাখিতেন। সাধুমহিমার প্রতি তিনি সদা সতর্ক থাকিতেন, তিনি স্বয়ং সাধুসেবারূপ মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠান করিতেন এবং ভক্তগণকেও সাধুসেবার উপদেশ প্রদান করিতেন। সর্ব সময়ে তাঁহার নির্দেশ ইহাই যে কলিযুগে সন্তমধ্যেই সাক্ষাৎ ভগবৎ দর্শন হইয়া থাকে এবং সন্ত ও ভগবানে কোন ভেদ
পৃষ্ঠা ৪০
নাই। তাঁহার এই মতের সমর্থন গোস্বামী তুলসীদাসজীও বিনয় পত্রিকায় করিয়াছেন ঃ—
সন্ত ভগবন্ত অন্তর নিরন্তর নহি,
কিমপি কহ মলিন মতি দাসতুলসী।
শ্রীমহারাজজীর সাধুসেবা, হরিভক্তি, ভজন, আচার বিচার ও পরম্পরা দর্শন করিয়া অনেক ভক্ত তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন এবং তাঁহারা শ্রীমহারাজজীর আদর্শে জীবন যাপন করিতে লাগিলেন। এই সকল ভক্তগণ তাঁহাকে কাশীতে নিবাস করিতে প্রার্থনা করিলেন এবং সাধুসেবার নিমিত্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্য সম্ভার প্রদান করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সকল দ্রব্যসম্ভার দ্বারা শ্রীমহারাজজী সাধুসেবা করিতে লাগিলেন। তাঁহার সাধুসেবার সুব্যবস্থা ও বিনম্র প্রভাবে বেদান্তীবাগে বহু সন্তের সমাগম হইতে লাগিল।
॥ পঞ্চাগ্নিদ্বারা মারের দয়া শান্ত করণ ॥
বেদান্তীবাগে কোনও এক সমরে শ্রীমহারাজজী পঞ্চতপার সাধন যথা নিয়মে করিতেছিলেন। এই সাধন সময়ে অকস্মাৎ তাঁহার জ্বর হইল ও দুই দিবস পরে সর্বশরীরে বসন্ত রোগের অসংখ্য জলপূর্ণ গুটিকার আবির্ভাব হইল। এই অবস্থায়ও শ্রীমহারাজজী সাধন ও নিয়ম ত্যাগ করিলেন না। এক দিবস রোগের বিকরালতা দেখিয়া স্নেহীভক্তগণ তাঁহাকে সবিনয়ে বলিলেন—“মহারাজজী, আপনি আজ পঞ্চতপার সাধন ও নিয়ম স্থগিত রাখুন নতুবা রোগের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পাইবে।” শ্রীমহারাজজী বলিলেন—“এক দিবসও সাধনের নিয়ম লঙ্ঘন করিলে পূর্বকৃত সাধন সম্পূর্ণভাবে খণ্ডিত হইবে ; সুতরাং রোগ শান্তি হউক অথবা বৃদ্ধিপাপ্ত হউক আমি অবশ্যই পঞ্চতপা সাধন এক দিবসের জন্যও পরিত্যাগ করিব না।” এইৰূপ বলিয়া তিনি তাঁহার চতুর্দিকে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করিয়া আহুতি প্রদান পূর্বক অগ্নির মধ্যে উপবেশন করিয়া মন্ত্র জপ করিতে লাগিলেন। অগ্নির ভীষণ তাপে গুটি সমূহ হইতে জল আপনা হইতে বাহির হইয়া অতি শীঘ্র সমগ্র জল শুষ্ক হইয়া গেল। আড়াই ঘণ্টা যাবৎ মন্ত্র জপের নিয়ম পূর্ণ করিয়া শ্রীমহারাজজী যখন প্রসন্ন চিত্তে আসন হইতে উত্থিত হইলেন তখন সমবেত ভক্ত মণ্ডলী বলিতে লাগিল যে শ্রীমহারাজজী বসন্ত রোগকে জ্বালাইয়া দিয়াছেন। সেই দিবসেই শ্রীমহারাজজী সম্পূর্ণরূপে বসন্ত রোগমুক্ত হইয়াছিলেনন। এই প্রকার নিষ্ঠা ও দৃঢ় সঙ্কল্প দ্বারা তাঁহার প্রত্যেক সাধন নিয়ম অক্ষুণ্নরূপে সদাই পূর্ণ হইতে লাগিল।
॥ সাধনের গভীরে প্রবেশ ও ভগবৎ সাক্ষাৎকার ॥
বেদান্তীবাগের মধ্যে প্রায় শতফুট দূরবর্তী এক নির্জন স্থানে অবস্থানপূর্বক শ্রীমহারাজজী কেবল মাত্র দুগ্ধপান করিয়া মন্ত্ররাজ শ্রীরামমন্ত্রের অনুষ্ঠানে মগ্ন
পৃষ্ঠা ৪১
হইলেন। এই প্রকারে বেশ কয়েক বৎসর অতিক্রান্ত হইল। এই সময়ে তাঁহার তীব্র বৈরাগ্য, ত্যাগ, তপশ্চৰ্য্যা-ব্রতাদি সাধন ও প্রভুর চরণ-নখ-মণিচন্দ্রিকায় দৃঢ় অনুরাগ নিমিত্ত ঈশ্বরানুভূতি সম্পন্ন শরীর তেজে দেদীপ্যমান লক্ষিত হইত এবং তাঁহার প্রশস্ত ললাট সূর্য সদৃশ প্রকাশমান হইয়াছিল। তাঁহার হৃদয়ে যে দিব্য জ্যোতির প্রকাশ হইয়াছিল উহা বাক্যের অতীত। এই অবস্থায় এক দিবস জপ কালে শ্রীমহারাজজী শ্রীরামজানকীর মানসীসেবা ও যুগল ধ্যানানন্দে বিশেষরূপে বিভোর ছিলেন—নেত্রযুগল প্রেমাশ্রু পরিপূর্ণ, শরীর রোমাঞ্চিত, দেহবোধ বিরহিত। এই ভাবে কিছুক্ষণ অতিবাহিত হইলে কিঞ্চিৎ বাহ্যজ্ঞানের উদয় হইল। তিনি নয়ন উন্মীলন মাত্র দেখিলেন যে সম্মুখে জগতপতি শ্রীরামচন্দ্র জগন্মাতা শ্রীজানকী শ্যাম-গৌর মূর্তিতে বিদ্যমান। প্রথম সর্বাঙ্গসুন্দর স্বরূপের অলভ্য দর্শন পাইয়া শ্রীমহারাজজী সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ পূর্বক তাঁহাদের শ্রীচরণারবিন্দে মস্তক স্থাপন করিলেন। পরম করুণাবরুণালয় ভগবান শ্রীরামচন্দ্র শ্রীমহারাজজীর মস্তক তাঁহার করকমল দ্বারা স্পর্শ করিয়া হস্তধারণ পূর্বক ভূমি হইতে উত্তোলন করিলেন এবং তাঁহাকে “অচলাভক্তি ও সর্ব মনোরথ পূর্ণ হইবে” এই বর প্রদান করিয়া উভয়ে অন্তর্ধান করিলেন। এই সময়ে শ্রীমহারাজজী প্রতিদিন পঞ্চাশ সহস্র শ্রীরামমন্ত্র জপে নিমগ্ন থাকিতেন এবং এইভাবে সাড়ে তিন কোটি জপ অনুষ্ঠান পূর্ণ করিলেন। অনুষ্ঠানান্তে শ্রীরাম যজ্ঞ ও সন্ত-ব্রাহ্মণের অতি বিশাল ভান্ডারা মহোৎসব অনুষ্ঠিত হইয়াছিল।
॥ জেল अधिकारীর শ্রীমহারাজজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ ॥
কাশীর উত্তর প্রান্তে চৌকাঘাট মহল্লায় কাশী ডিস্ট্রিক্ট জেল অবস্থিত। উক্ত জেলের জেল অধিকারী শ্রীরঘুনন্দন প্রসাদ বলিয়া নিবাসী ব্রাহ্মণ ছিলেন। দৈববশাৎ তাঁহার পরপর ছয় সাতটি কন্যা জন্মগ্রহণ করিল। অপুত্রক হওয়ায় তাঁহার মনে যথেষ্ট ক্লেশ ছিল। সুতরাং তিনি পুত্রলাভের অভিলাষে শ্রীমহারাজজী সমীপে আগমন পূর্বক পুত্রপ্রাপ্তি নিমিত্ত অতিশয় দীনভাবে প্রার্থনা করিয়া বলিলেন—“আপনি কৃপা করিয়া যদি কোন দৈবী উপায় করেন, আমার নিশ্চয়ই পুত্র লাভ হইবে।” শ্রীরঘুনন্দন প্রসাদজীর দপ্তরের লিপিকার শ্রীকালীচরণ শ্রীবাস্তব পূর্বেই শ্রীমহারাজজীর শরণ গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনিও শ্রীমহারাজজীকে বিনম্রভাবে বলিলেন—“আপনি কৃপা করিলেই শ্রীরঘুনন্দন প্রসাদজীর সহজেই পুত্রলাভ হইবে। আপনি স্বভাবতই দয়ালু।” শ্রীমহারাজজী এই দারুণ পরিস্থিতিতে কৃপাপূর্বক যথাযথ বিচার করিয়া পত্নীর গর্ভ পরিবর্তন নিমিত্ত এক তান্ত্রিক যন্ত্র প্রস্তুত করিয়া বলিলেন—‘ইহা আপনার ধর্মপত্নীর
পৃষ্ঠা ৪২
গলদেশে পরিধান করাইবেন, ইহাতে অবশ্যই আপনার পুত্র জন্মগ্রহণ করিবে।” শ্রীমহারাজজীর আদেশ অনুসারে শ্রীরঘুনন্দন প্রসাদজী তাহাই করিলেন। ভগবত কৃপা ও শ্রীমহারাজজীর করুণায় যথা সময়ে শ্রীরঘুনন্দন প্রসাদজী এক সুন্দর পুত্ররত্ন লাভ করিয়া ধন্য ধন্য করিতে লাগিলেন এবং তিনি ও তাঁহার ধর্মপত্নী শ্রীমহারাজজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিলেন।
॥ যোগীরাজ শ্রীস্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজের বেদান্তীবাগে আগমন ॥
উত্তর প্রদেশান্তর্গত বস্তিজানপদে অবস্থিত কুদরহা আশ্রম নিবাসি শ্রীশ্রী১০০৮ শ্রীস্বামী যোগীরাজ প্রয়াগদাসজী মহারাজের পরিচয় ইতিপূর্বে প্রদত্ত হইয়াছে। শ্রীমহারাজজী বাল্যাবস্থায় ইহারই চরণচ্ছায় অষ্টাঙ্গযোগ সাধন, বৈরাগ্য, জ্ঞান, ভক্তি বিশিষ্টাদ্বৈত সিদ্ধান্ত ও স্বীয় সম্প্রদায় বৈশিষ্ট্য বিশেষরূপে শিক্ষা করিয়াছিলেন। যোগীরাজ স্বামী প্রয়াগদাসজী মহারাজ অতি অনুকম্পা বশত বহু সন্তের জমাাত লইয়া বেদান্তীবাগে পদার্পণ করিলেন। শ্রীমহারাজজী তাঁহাকে অতিশয় আদর-সম্মানের সহিত যথোচিত সেবা সৎকার করিলেন এবং স্বীয় গুরুদেবকে সানুনয়ে কিছুদিন বেদান্তীবাগে সেবার নিমিত্ত অবস্থান করিতে প্রার্থনা করিলেন। শ্রীমহারাজজীর প্রতি সাতিশয় বাৎসল্য স্নেহ বশত যোগীরাজ একপক্ষকাল তাঁহার আতিথ্য অঙ্গীকার করিলেন এবং তিনি মহারাজজীর সন্তসেবার রীতি ও প্রকাশ দেখিয়া অত্যন্ত প্রসন্ন হইলেন। যাত্রার প্রাক্কালে শ্রীমহারাজজীকে এই বলিয়া আশীর্বাদ প্রদান করিলেন—“তুমি যে স্থানেই অবস্থান করিবে সেই স্থানেই রিদ্ধিসিদ্ধির নূনতা থাকিবে না” যথা ঃ—
জিমি সরিতা সাগর মহঁ জাহীঁ।
যদ্যপি তাহি কামনা নাヒー ॥
তিমি সুখ সম্পত্তি বিনহি বোলায়ে।
ধরম শীল পহিঁ জাহীঁ সুভায়ে ॥
অর্থাৎ সাগর নদীকে কামনা না করিলেও নদী যে প্রকার সাগরে মিলিত হয় সেই প্রকার ঋদ্ধি সিদ্ধি সুখ-সম্পতি ধর্মশীলের প্রতি বিনা আমন্ত্রণেই ধাবিত হয়। যোগীরাজ স্বামী প্রয়াগদাসজীর আশীর্বচন অতীব সত্য ; কারণ অবিরল ঋদ্ধি সিদ্ধির প্রকাশে সাধুসেবার অবিরাম গতি নিত্য নতুন বিশাল ধারায় অদ্যাপিও প্রবাহিত হইতেছে।
॥ ভক্তমাল অনুষ্ঠান দ্বারা সন্তগণকে আহ্বান ॥
কাশীপুরীতে আগাগঞ্জ মহল্লায় ভগ্নেশ মাস্টার নামে শ্রীমহারাজজীর এক ভক্ত নিবাস করিতেন। তিনি সন্ত ও ভগবানের প্রতি অতি প্রীতি পোষণ
পৃষ্ঠা ৪৩
করিতেন এবং শ্রীমহারাজজীর প্রতি তিনি অতিশয় শ্রদ্ধা সম্পন্ন ছিলেন। তিনি প্রত্যহ প্রাতে ও সন্ধ্যায় শ্রীমহারাজজী সমীপে আগমন পূর্বক সন্তসেবায় বিশেষভাবে সহায়তা করিতেন। একদিন তিনি শ্রীমহারাজজীকে দণ্ডবৎ প্রণাম পূর্বক অতি বিনয় ভাবে কৃতাঞ্জলি হইয়া প্রার্থনা করিলেন—"মহারাজজী! আমার হৃদয়ে এক বিশেষ অভিলাষের অভ্যুদয় হইয়াছে, পরন্তু উহা আপনার কৃপা ভিন্ন পূর্ণ হইতে পারে না।" এই প্রকার উক্তি করিয়া তিনি তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন। তাঁহার প্রার্থনা শুনিয়া শ্রীমহারাজজী প্রসন্নতা সহকারে বলিলেন—"আপনার হৃদয়ে এমন কোন্ অভিলাষের উদগম হইয়াছে যাহা প্রকাশ করিতে করিতে মৌনতা অবলম্বন করিলেন?" তখন তিনি বলিলেন—"আমি নূন্যপক্ষে একশত অথবা একশত পঁচিশ মূর্তি সর্বাঙ্গে বিভূতি লিপ্ত সন্তের নিমিত্ত এক ভাণ্ডারা প্রদান করিতে ইচ্ছা করি এবং এই সন্তগণ কাশীর স্থানীয় হইবেন না, পরন্তু কাশী ভিন্ন অন্য স্থান হইতে আগমন করিবেন এবং উহারা তপস্বী, ত্যাগী হইবেন এবং বিনা আমন্ত্রণে স্বেচ্ছায় আগমন করিবেন।" তাঁহার এই প্রকার অতি অদ্ভুত প্রার্থনা শুনিয়া শ্রীমহারাজজী হাস্য সহকারে বলিলেন—এই প্রকার কঠিন ভাবনা আপনার হৃদয়ে আজ কি প্রকারে উদিত হইল?" তিনি বলিলেন—"শ্রীহরির ইচ্ছা" এবং এই রূপ বলিয়া তিনি মৌন হইয়া রহিলেন। শ্রীমহারাজজী তাঁহার হৃদয়ের এই সৎ ভাবনায় প্রসন্ন হইয়া বলিলেন—"আপনার মনোরথ শীঘ্র পূর্ণ হইবে।"
পরদিবস হইতে শ্রীমহারাজজী সন্ত আবাহনের সঙ্কল্প মন্ত্র পাঠ করিয়া অনুষ্ঠান পূর্বক ভক্তমাল গ্রন্থ পাঠ করিতে লাগিলেন। এই অনুষ্ঠান ও পাঠের তিন দিন অতিক্রান্ত হইলে ভক্তাভীষ্ট পুরক শ্রীভগবান হরিদ্বারে উপস্থিত “তেরভাই ত্যাগীগণের” শ্রীমহন্ত সীয়ারামদাসজী মহারাজের হৃদয়ে এইরূপ প্রেরণা করিলেন—যে তাঁহার মনে হইল এইক্ষণে এই স্থান হইতে কাশীধামে যাত্রা আবশ্যক এবং তিনি একশত ত্যাগী সন্তের জমাৎ লইয়া চতুর্থ দিনে কাশীধামে আগমন করত বেদান্তীবাগে শ্রীমহারাজজীর সন্নিধানে আসন স্থাপন করিলেন। শ্রীমহন্ত সীয়ারামদাসজী ও শ্রীমহারাজজী পূর্ব হইতে পরিচিত ছিলেন। অতএব উহারা পরস্পরের দর্শন লাভ করিয়া প্রীত হইলেন এবং শ্রীমহারাজজী তাঁহাকে যথোচিত সমাদর-সংকার করিলেন। তখন আশ্বিন মাস—সমাগত সন্তগণ বেদান্তীবাগের উন্মুক্ত প্রান্তরে গোময় দ্বারা ভূমি সংস্কার পূর্বক আসন স্থাপন করিলেন। বেদান্তীবাগের উন্মুক্ত প্রান্তরে সন্তগণ এইরূপ শোভা পাইতেছিলেন মনে হইতেছিল যেন মানস সরোবর হইতে হংস সমুদায় আসিয়া পৃথিবীকে মণ্ডিত করিয়া রহিয়াছে।
শ্রীমহারাজজী সমীপে সন্ত জমাতের সমাগম হইয়াছে জানিয়া ভক্তগণ
৪৩
পৃষ্ঠা ৪৪
মাঝীর এইরূপ আনন্দিত হইলেন যে তিনি দ্রুতবেগে আগমন পূর্বক শ্রীমহারাজজীর শ্রীচরণে লুটাইয়া পড়িলেন এবং বিনয় সহকারে বলিতে লাগিলেন—"আপনার কৃপা অপার, আপনি অনুষ্ঠান দ্বারা সন্তগণকে আহ্বান করিয়াছেন—এখন আমি জানিলাম সাক্ষাৎ পরম প্রভু আপনার স্বরূপে এই দীনজনের হিতের নিমিত্ত প্রকট হইয়াছেন।" এই প্রকার প্রার্থনা করিয়া তিনি নিজ আবাসে গমন করিয়া সাধুসেবার দ্রব্যসম্ভার সংগ্রহ করিয়া শ্রীমহারাজজীর চরণে অর্পণ করিলেন। ঐ সকল দ্রব্যসম্ভার দ্বারা সন্তগণ স্বয়ং পাক করিয়া শ্রীভগবানকে সাদরে নিবেদন করিলেন এবং সকলে নিবেদিত প্রসাদ গ্রহণ করিলেন ও উপস্থিত ভক্তগণকেও প্রসাদ ভোজন করাইলেন। এই প্রকারে প্রত্যহ ভক্তগণ পক্ষ হইতে প্রদত্ত দ্রব্য দ্বারা নানা প্রকার রসুই হইতে লাগিল ও সন্তগণ যতদিন পর্যন্ত অবস্থান করিলেন ততদিন প্রত্যহ ঘৃতপক্ক রসুইয়ের ব্যবস্থা সুচারুরূপে হইতে লাগিল। শ্রীমহারাজজীর সন্তসেবার ভাব, রীতি-নীতি দেখিয়া শ্রীমহন্ত সীয়ারামদাসজী মহারাজ অতি প্রভাবিত হইয়া আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষ নবরাত্রি হইতে কার্তিক মাসের শুক্ল অক্ষয় নবমী পর্যন্ত বেদান্তীবাগে অবস্থান করিয়া বালিয়া জেলার গঙ্গাসরযূ সঙ্গমে স্নানের নিমিত্ত গমন করিলেন। শ্রীমহন্তজীর গমনের পরেও প্রতিদিন পুরী, শাক, মিষ্টান্ন আদি ঘৃতপক্ক ভোজ্য দ্রব্যসমূহ শ্রীঠাকুরজীর ভোগে প্রদত্ত হইত; ডাল, মহাপ্রসাদ, রুটি আদি অপক্ক ( কাঁচি ) ভোজ্য-দ্রব্য প্রস্তুত বন্ধ ছিল। ইহার কারণ প্রায়শই তপস্বী, ত্যাগী সন্ত সংখ্যায় ২০ হইতে ৩০ মূর্তি বেদান্তীবাগে অবস্থান করিতে থাকেন এবং ইহারা ঘৃতপক্ক ভোজ্যে অধিক, রুচিসম্পন্ন ছিলেন। এই নিয়ম ৩ বৎসর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বেদান্তীবাগে এইরূপ সাধুসেবার যথেষ্ঠ সুযোগ ছিল; কারণ চৌকা ঘাটে অবস্থিত জেলের জেলর এক বস্তা শাক-সবজি প্রতিদিন পাঠাইতেন এবং অন্যান্য ভক্তগণ বস্তাবন্দী আটা, খাঁটি ঘৃতপূর্ণ টিন দ্বারা কোঠার ঘর সর্বদাই পূর্ণ রাখতেন। সেই সকল ভক্তগণ সাধুসমাগম ও শ্রীমহারাজজীর সান্নিধ্যে অতিশয় সুখবোধ করিতেন। এই প্রকারে সাধুসমাগমের দুর্লভ লাভ শ্রীমহারাজজীর দ্বারাই কাশীবাসি ভক্তগণ নিত্যনিরন্তর প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন।
॥ উজ্জয়িনী কুম্ভে গমন ॥
বেদান্তীবাগে এইভাবে তিন বৎসর অতিক্রান্ত হইলে উজ্জয়িনীতে কুম্ভ স্নানের পুণ্যতিথি আসিয়া পড়িল এবং শ্রীমহারাজজী উজ্জয়িনী যাত্রা করিলেন। স্মরণাতীত কাল হইতে কুম্ভস্নান উপলক্ষে পুণ্যভূমি ভারতের সন্তগণ কুম্ভমেলায় সম্মিলিত হইয়া থাকেন। তাঁহারা এই দেবভূমি ঋষি মুনির নিবাস স্থান
৪৪
পৃষ্ঠা ৪৫
ভারতের ধর্মসংস্কৃতির ধারক ও বাহক। এই সন্ত সম্মেলনে মাসাধিক কাল উপস্থিত থাকিয়া তাঁহারা ভারতীয় সনাতন ধর্মের মহিমা প্রচার করিয়া থাকেন। শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব, গাণপত্য, সৌর প্রভৃতি মার্গের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সন্তগণ অতি সুপ্রাচীন কাল হইতে সনাতন ধর্মস্রোতের সহিত বাহিত মলভার পরিষ্কার করত এই ধর্মস্রোত নির্মল রাখিতে সচেষ্ট করিতেছেন। এই সন্ত সমাজে জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি ও অন্যান্য যোগের বিচার এবং হরিহরের যশকীর্তন বিশেষভাবে হইয়া থাকে। এই সন্তগণরূপ জলধর বেদ, পুরাণ প্রভৃতি শাস্ত্ররূপ মহোদধি হইতে ভগবত ভক্তিরূপ সুমিষ্ট বারি আহরণ পূর্বক মানব-সমাজরূপ ক্ষেত্রে বর্ষণ করিতেছেন; নির্গুণ ও সগুণব্রহ্মের উপাসনা, ও সগুণলীলার বৈশিষ্ট্য, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষাদি চতুর্বর্গ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, নবরস, জপতপ, বৈরাগ্য, প্রেম, ভক্তি প্রভৃতির ব্যাখ্যান দ্বারা অজ্ঞ মানবকে সনাতন ধর্মে প্রণোদিত করিতেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই কুম্ভ সম্মিলন আবহমান কাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। যথা রামচরিত মানসে বালকাণ্ডেঃ—
তহিঁ হোই মুনিঝষ্য সমাজা।
জাই জে মজ্জহিঁ তীর্থ রাজা ॥
মজ্জহি প্রাত সমেত उछাহা।
কহহি পরস্পর হরি গুণ গাহা ॥
ব্রহ্ম নিরুপণ ধর্মাবিধি বরনহি তত্ত্ব বিভাগ।
কহহি ভগতি ভগবন্তু কৈ সংজু ত জ্ঞান, বিরাগ ॥
সন্তদর্শন, সৎকথা শ্রবণ, কুম্ভযোগ স্নান এই মহান উদ্দেশ্যেই ভারতভূমির বিভিন্ন প্রদেশপ্রান্ত হইতে পুণ্যাৰ্থীগণ কুম্ভমেলায় সমবেত হইয়া থাকেন। কুম্ভযোগে বা কুম্ভপর্বে এই মহামিলন হয় এই নিমিত্ত ইহার নাম কুম্ভমেলা। স্কন্দপুরাণে কুম্ভযোগের স্থান কাল ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হইয়াছে। যথাঃ—
বসন্তে বিষুবে চৈব ঘটে দেবপুরোহিতে।
গঙ্গাদ্বারে চ কুম্ভাখ্যঃ সুধামেতি নরো যতঃ ॥
দেব পুরোহিত বৃহস্পতি যখন বসন্তকালে বিষুব সংক্রান্তিতে অর্থাৎ সূর্য্যের মেষ রাশিতে সংক্রমণ কালে কুম্ভরাশিতে অবস্থান করেন তখন হরিদ্বারে কুম্ভ সম্মিলন হইয়া থাকে। এই যোগে মনুষ্য সুধা লাভ করে।
মেষরাশি গতে জীবে মকরে চন্দ্রভাস্করো।
অমাবস্যা তদা যোগঃ কুম্ভাখ্যা তীর্থ নায়কে ॥
বৃহস্পতি মেষ রাশিতে, চন্দ্রসূৰ্য্য মকর রাশিগত এবং তিথি অমাবস্যা হইলে তীর্থরাজ প্রয়াগে অমৃত কুম্ভযোগ হইয়া থাকে।
৪৫
পৃষ্ঠা ৪৬
কর্কে গুরুত্ব ধনুশ্চন্দ্রচন্দ্রসূর্যাভ্যাং ॥
গোদাবর্যাং তদা কুম্ভ জায়তে অবনীমণ্ডলে ॥
কর্কটরাশিতে বৃহস্পতি, সূর্য্যচন্দ্র অবস্থিত হইলে এবং অমাবস্যা তিথিতে গোদাবরী তটে ( নাসিক ) কুম্ভযোগ হইয়া থাকে।
ঘটে পুরি শশীসূর্য্য দামোদরে স্থিত যদা।
ধরায়ান চ তদা কুম্ভ জায়তে খলু মুক্তিদঃ ॥
তুলারাশিতে বৃহস্পতি সূর্য্য ও চন্দ্র সংযোগ এবং তীর্থ অমাবস্যা হইলে ধারা অর্থাৎ উজ্জ্বলিনীতে সুকুম্ভ যোগ হইয়া থাকে।
পুরাণে কুম্ভযোগের উৎপত্তি বিষয় এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে। পুরাকালে দেব ও দৈত্যগণ অমৃতলাভের অভিলাষে ক্ষীর সমুদ্র মন্থন করিতে লাগিলেন। এই মন্থন কার্যে মন্দার পর্বত মন্থন দণ্ডরূপে, নাগরাজ বাসুকি মন্থন রজ্জুরূপে, মহাকূর্ম মন্থন পৃষ্ঠরূপে এবং ভগবান বিষ্ণুর বাহু উক্ত মন্থনদণ্ড রক্ষার্থ ব্যবহৃত হইয়াছিল। বাসুকির পশ্চাৎ দিক ইন্দ্র প্রমুখ দেববৃন্দ ও মুখের দিক বলি প্রমুখ দৈত্যবৃন্দ ধারণ করিয়া মন্থন কার্য আরম্ভ করিলে নাগরাজ বাসুকির মুখ হইতে তীব্র হলাহল নির্গত হইতে লাগিল এবং তাহার ভস্মায় লোক সমূহের মূর্ছা উপস্থিত হইল। দেবগণের প্রার্থনায় শ্রীমহাদেব হলাহল পান করিয়া লোকরক্ষা করিলেন। ক্ষীরোদ সাগর হইতে বহুমূল্য রত্নরাজি উত্থিত হইতে লাগিল—গৃহক রথ, ঐরাবৎ হস্তী, পারিজাত বৃক্ষ, কৌস্তুভমণি, বালচন্দ্র, মণিময় কুণ্ডলসমূহ, সুবৃহৎ ধনু, লক্ষ্মী, সুশীলা, সুরূপা, সুলভা ও সুরভি এই পঞ্চ কামধেনু, উচ্চৈশ্রবা অশ্ব, লক্ষ্মীদেবী, বিশ্বকর্মা, এবং ধন্বন্তরী প্রভৃতি। এই ধন্বন্তরীর হস্তে সুধাপূর্ণ একটি কুম্ভ ছিল। সুধাকুন্ত উত্থিত হইবামাত্র দেবগণের ইঙ্গিতে ইন্দ্রতনয় বৈজয়ন্ত সুধাপূর্ণ কুম্ভটি লইয়া পলায়ন করিতে উদ্যত হইলেন। দৈত্যগুরু শুক্রাচাৰ্য্য ইহা লক্ষ্য করিয়া দৈত্যগণকে বৈজয়ন্তের অনুসরণ করিতে ইঙ্গিত করিলে দৈত্যগণ তাহার পশ্চাদ্ধাবন করিয়া অমৃত কুম্ভ কাড়িয়া লইলেন। বৈজয়ন্ত ও দেবগণ হইতে সুধাকুম্ভ পুনরায় কাড়িয়া লইলেন। এইরূপে দেবগণ ও দৈত্যগণ মধ্যে যুদ্ধ হইতে লাগিল। যখন দেবদানবগণের মধ্যে অমৃতকুন্ড লইয়া দশদিকে দ্বাদশ দিন ও দ্বাদশ রাত্রি ব্যাপী সংগ্রাম চলিতেছিল তখন ঐ অমৃতকুম্ভটি তাহাদের হস্তচ্যুত হইয়া মর্তলোকে হরিদ্বার, নাসিক, প্রয়াগ ও উজ্জয়িনী এই চারিস্থানে চারিবার এবং অন্যান্য লোকে আটবার সৰ্সমেত দ্বাদশবার পতিত হইয়াছিল। এইরূপে যে যে স্থানে সুধাকুন্ত পতিত হইয়াছিল অদ্যাপিও সেই সেই স্থানে কুম্ভযোগ বা পর্ব হইয়া থাকে। সুধাকুম্ভ যখন পতিত হইয়াছিল তখন বৃহস্পতি, চন্দ্র, সূর্য্য ও শনি এই চারিজন উহা রক্ষা করিয়াছিলেন; যাহাতে সুধা পড়িয়া না যায়
৪৬
পৃষ্ঠা ৪৭
তজ্জন্য চন্দ্র, যাহাতে কুম্ভ ভগ্ন না হয় তজ্জন্য সূর্য্য, জয়ন্ত যাহাতে অমৃতকুম্ভ আত্মসাৎ না করিতে পারে তজ্জন্য শনি এবং যাহাতে কুম্ভ দৈত্যগণদ্বারা নষ্ট না হয় তজ্জন্য বৃহস্পতি রক্ষক ছিলেন। অতএব যে বৎসরের যে রাশিতে সূর্য্য চন্দ্র ও বৃহস্পতির সংযোগ ঘটিবে সেই বৎসর সেই রাশিতে অমৃতকুন্তপাত স্থলেই কুম্ভযোগ হইবে ইহাই নিয়ম। পূর্বে বলা হইয়াছে এই যুদ্ধ দ্বাদশ অহোরাত্র হইয়াছিল এবং দ্বাদশ দিনে দ্বাদশবার সুধাকুম্ভের পতন হইয়াছিল, ইহা দেব পরিমাণ। দেবলোকের একদিন মর্তলোকের এক বৎসর হয়; সুতরাং দেবলোকের দ্বাদশদিনে মনুষ্যলোকের দ্বাদশ বৎসর। এই নিমিত্ত দ্বাদশ বৎসরে বা দেবলোকের দ্বাদশ দিনে কুম্ভযোগ হওয়াই নিয়ম। মর্তলোকে চারিস্থান ব্যতিত অন্যান্যলোকেও যে আটটি স্থানে অমৃত কুম্ভ পতিত হইয়াছিল সেই সকল স্থান মানুষের অগম্য, উহা কেবলমাত্র দেবলোকের জন্য। যে ব্যক্তি এই সকল কুম্ভযোগে যোগস্থানে গমন ও স্নান করেন তিনি মুক্তি লাভ করেন; দেবগণও এই সকল ব্যক্তিকে প্রণাম করেন।
এই কুম্ভ পর্বে বিভিন্ন প্রদেশাগত সাধু-সন্ন্যাসীবৃন্দ শাস্ত্র আলোচনায় প্রবৃত্ত হইয়া আধ্যাত্মিক জীবন গঠনে নূতনতর প্রেরণা ও উপাদান সংগ্রহ করিতে সক্ষম হন এবং সমাগত গৃহস্থগণও তাঁহাদের সান্নিধ্যে আসিয়া সাধন-ভজনের পথ নির্দেশ প্রাপ্ত হইয়া ধর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেন। ইহা দ্বারা জনজীবন প্রভূত পরিমাণে পরিচ্ছন্ন হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত সাধু-সন্ন্যাসীগণ স্বীয় মণ্ডলীসহিত মেলাস্থলে অবস্থান করেন। সন্ন্যাসীগণের মধ্যে আচার্য্য শঙ্কর প্রবর্তিত দশনামী সম্প্রদায় এবং অবধূত, কুটিচক, বহুদক, প্রভৃতি বহু শাখা দৃষ্ট হয়। দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত দণ্ডী, পরমহংস, নাগা ইত্যাদি সন্ন্যাসীগণ লক্ষ সংখ্যায় যোগদান করেন। বৈষ্ণব সম্প্রদায় ভুক্ত সন্তগণ স্বীয় জমাৎ লইয়া অগণিত সংখ্যায় মেলাস্থলে সমবেত হইয়া থাকেন; ইঁহাদের মধ্যে শ্রীরামানন্দীয় বৈষ্ণব সন্তগণ সংখ্যায় সর্বাধিক পরিদৃষ্ট হয়। শ্রীরামানন্দীয় সম্প্রদায় অন্তর্গত তেরভাইত্যাগী খালসার তের জন মহন্ত বর্তমান। শ্রীমহারাজজী এই তেরভাইত্যাগী খালসার এক মহন্ত।
শ্রীমহারাজজী উজ্জয়িনীতে আগমন পূর্বক মঙ্গলঘাটে তেরভাইত্যাগী খালসায় ( আশ্রম ) অবস্থান করেন। এই তেরভাইত্যাগী খালসায় তেরজন মহন্ত একই শ্রেণীর অন্তর্গত এবং তাঁহারা পরস্পর পরস্পরের প্রতি সৌভ্রাতৃত্ব ভাব ভাবিত থাকেন এবং ভ্রাতৃবৎ একত্র অবস্থান করেন। এই খালসায় ( আশ্রমে ) ন্যূন পক্ষে দশ সহস্র সন্ত অবস্থান করিয়া থাকেন এবং তাঁহাদের রসুই ও ভোজন একত্রেই হইয়া থাকে। তেরভাইত্যাগী খালসায় শ্রীশ্রীঅনন্ত শ্রীবিভূষিত শ্রীশ্রী ১০০৮ স্বামী ত্রিবেণীদাসজী মহারাজ এক মহন্ত ছিলেন।
৪৭
পৃষ্ঠা ৪৮
ইঁহার নিকট হইতে বহু পূর্বে কোন সময়ে শ্রীমহারাজজী বিভূতি ধারণব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন। সাধুগণের মধ্যে সর্বাঙ্গে মন্তপূত বিভূতি ( হোমের ভস্ম ) লেপনের নিয়ম বর্তমান। ইহা গুরুদেবের নির্দেশে কোন উচ্চকোটি মহাত্মার নিকট হইতে গ্রহণ করিতে হয়। শ্রীমহারাজজী শ্রীস্বামী ত্রিবেণীদাসজী মহারাজ হইতে বিভূতি লাভ করিয়া নিত্য বিভূতি লেপন ও নিত্য হোমের নিয়ম করিয়াছিলেন এবং এই নিয়মের কখনও ব্যতিক্ৰম হয় নাই। শ্রীস্বামী ত্রিবেণীদাসজী মহারাজের তিরোধানের পরে তেরভাইত্যাগী খালসায় তাঁহার শূন্য পদে শ্রীমহারাজজী অভিষিক্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং স্বীয় সম্প্রদায়ের তেরভাইত্যাগী খালসার এক মহন্ত রূপে শ্রীমহারাজজী উজ্জয়িনী নগরীতে এক মাস পর্যন্ত নিবাস পূর্বক নিত্য শীপ্রাগঙ্গায় স্নান, প্রাত্যহিক নিয়ম, ভোজন পূজন নিরত থাকিয়া সৎসঙ্গ রূপ অমৃত আস্বাদন করিলেন; যথা—
বেদ পয়সিন্ধু সুবিচার মন্দর মহা, অখিল মুণিবুন্দ নির্মমন কর্তা।
সার সৎসঙ্গমুদ্ধত্য ইতি নিশ্চিতং বদত শ্রীকৃষ্ণ বৈদণ্ডি ভর্তা ॥
( তুলসীদাস গোস্বামী—বিনয় পত্রিকা )
৪৮
Comments
Post a Comment