অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 4)

অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ  (পর্ব - 4)

বৈরাগ্য বেশ গ্রহণ



জানকী বল্লভো বিজয়তে || শ্রী সীতারামাভ্যাং নমঃ || শ্রী হনুমতে নমঃ

লেখনীতে: কিশোর দাস (শ্রী মহারাজ জির কৃপাপ্রাপ্ত শ্রী রাম কিশোর ভট্টাচার্য)

নমস্কার ও জয় সিয়ারাম,

রামানন্দী সম্প্রদায়ের ভাস্কর, পরম পূজনীয় মহান সাধক এবং আমাদের পরম গুরুদেব অনন্ত শ্রী আচার্যপাদ শ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ-এর চরণে কোটি কোটি দণ্ডবৎ প্রণাম।

যাঁদের পুণ্যময় জীবন, অলৌকিক কর্মসাধন এবং অমৃতময় উপদেশ আমাদের আধ্যাত্মিক পথের আলোকবর্তিকা, সেই মহাপুরুষের দিব্য জীবনগাথা কোনো একটি লেখায় বা একবারে প্রকাশ করা অসম্ভব। শ্রী মহারাজ জির অহৈতুকী কৃপা এবং আদেশে, তাঁর সেই আলোকোজ্জ্বল জীবন, সাধনকাল এবং কল্যাণময়ী শিক্ষাকে আমরা এই মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে (বিভিন্ন পর্বে) আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি।

"মহাপুরুষদের জীবন কথা কেবল পড়ার জন্য নয়, তা নিজের জীবনে ধারণ করে পরমার্থ লাভের পথ প্রশস্ত করার জন্য।"

শ্রী মহারাজ জির পরম কৃপাধন্য শিষ্য শ্রী কিশোর দাস (শ্রী রাম কিশোর ভট্টাচার্য) মহাশয়ের লেখনীর মাধ্যমে গুরুদেবের জীবনের অন্তহীন অমৃত-কথা পর্বানুসারে নিয়মিত পোস্ট করা হবে। আশা করি, শ্রী মহারাজ জির এই জীবন-প্রসঙ্গ আপনাদের সকলের হৃদয়কে ভক্তি ও শান্তিতে ভরিয়ে তুলবে এবং আধ্যাত্মিক মার্গে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

গুরুদেবের চরণে প্রার্থনা জানিয়ে আসুন আমরা সবাই মিলে এই পুণ্যময় কথামৃতের আস্বাদ গ্রহণ করি।

জয় শ্রীরাম। জয় গুরুদেব।

----------------------------

 পৃষ্ঠা ২৮

দ্বিতীয় অধ্যায়

বৈরাগ্য বেশ গ্রহণ

রামস্য নামরূপং চ লীলাধাম পরাৎপরম্।

এতচ্চতুষ্টয়ং নিত্যং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহম্॥ ( বশিষ্ঠ সংহিতা )

 

প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের নাম রূপ লীলাধাম এই সকলই তাঁহার সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ। সাকেতধাম অর্থাৎ অযোধ্যাপুরীকে অথর্ববেদ দেবগণের পুরী বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন—"অষ্টচক্রা নবদ্বারা দেবানাং পূরযোধ্যা"। বৃদ্ধযামল তন্ত্রে ভগবান শঙ্কর দেবী পার্বতীকে বলিয়াছেন :—

অযোধ্যা চ পরম ব্রহ্ম সরযূঃ সগুণ পুমান্।

তন্নিবাসি জগন্নাথঃ সত্যম্ বদাম্যহম্॥

অযোধ্যা দর্শনে দেবি দিব্যদেহমবাপ্নুযাৎ।

ন দুর্গতিমবাপ্নোতি সিদ্ধিং প্রাপ্নোতি চোত্তমাম্॥

 

ইহার অর্থ—সাকেত ধাম পরব্রহ্ম এবং সরযূ সগুণ ব্রহ্ম, ইহার নিবাসি প্রভু জগন্নাথ শ্রীরামচন্দ্র সতাসত্যই বলিতেছি ; হে দেবী অযোধ্যা দর্শনমাত্র মনুষ্য দিব্য দেহ প্রাপ্ত হয়, তাহার সর্বসিদ্ধি হয় ও তাহার কোন দুর্গতি হয় না। স্কন্দ পুরাণে নিম্নলিখিত শ্লোকে সাকেত ধামের মহিমা বর্ণনা করা হইয়াছে।

মন্বন্তর সহস্রেস্তু কাশী বাসেমু যৎফলম্। তৎ ফলম্ সমবাপ্নোতি সরযূ দর্শনে কৃতে॥ مথুরায়াং কল্পমেকং মানবো বসতি যদি। তৎ ফলম্ সমবাপ্নোতি সরযূ দর্শনে কৃতে॥ ষষ্টি বর্ষ-সহস্রাণি ভাগীরথ্যবগাহনম্। তৎ ফলম্ নিমিষার্দ্ধং কলোদাশরথীং পুরীম্॥

অর্থাৎ সহস্র মন্বন্তর কাশীধামে যে মোক্ষ ফলপ্রাপ্ত হওয়া যায় সেই মোক্ষফল সরযূ দর্শন মাত্রে হইয়া থাকে। মথুরা পুরীতে কল্পকাল বাস করিলে যে ফল লাভ হয় সরযূ দর্শনে সেই ফল লাভ হয়। ষষ্টি সহস্রবর্ষ গঙ্গাস্নানে

পৃষ্ঠা ২৯

যে ফল, এই কলিকালের শ্রীরামচন্দ্রের ধাম অযোধ্যাধামে অর্দ্ধ নিমিষে প্রাপ্ত হওয়া যায়। ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বলিয়াছেন :—

যদ্যপি সব বৈকুণ্ঠ বখানা। বেদ পুরাণ বিদিত জগ জানা॥ অবধপুরী সম প্রিয় নহি সোঊ। রূঢ় প্রসঙ্গ জানউ কোউ কোউ॥ ( রাম চরিত মানস )

সুতরাং অযোধ্যাপুরী সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ ইহা সুস্পষ্ট ; পরন্তু অযোধ্যাপুরী প্রভুর অচল বিগ্রহ যাঁহাকে কেহ কোথাও লইয়া যাইতে সক্ষম নহে। এই নিমিত্ত ভক্তকেই শ্রীধামে গমন করিতে হয়। যুগে যুগে ভক্তগণই অযোধ্যাধামে গমন পূর্ব্বক পরম ফলপ্রাপ্ত হইয়া থাকেন। আনুমানিক খৃষ্টীয় উনবিংশতি শতাব্দির প্রথম ভাগ ; কোন পর্ব্ব উপলক্ষে পুণ্যার্থীগণের সমাগম হইয়াছে। উত্তর প্রদেশ সংলগ্ন বিহার প্রান্তের কোন এক গ্রাম হইতে এক ব্রাহ্মণী তাঁহার পঞ্চম বর্ষীয় পুত্রকে লইয়া এই পরম ধামে পুণ্যার্থীদের সহিত আগমন করিয়াছেন। সরযূ স্নান সমাপন পূর্ব্বক তাঁহারা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের বিগ্রহ দর্শন করিয়া এক সন্তের আশ্রমে উপনীত হইয়াছেন। পুণ্যার্থিগণ তেজপুঞ্জ কলেবর সন্তগণকে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণাম পূর্ব্বক তাঁদের সাধ্যমত সাধুসেবার নিমিত্ত অর্থ ও অন্যান্য দ্রব্যসম্ভার অর্পণ করিতেছেন। বালক সন্ত দর্শন করিয়া মাতাকে জিজ্ঞাসা করিল—“মা, এই সাধুমহাত্মাগণ এত বড় কি প্রকারে হইয়াছেন, ইহাদের মা কোথায়, ইহাদের কে খাইতে দেয়?” মাতা স্মিত হাস্যে বলিলেন—“বাবা, ইহঁারা রাম নাম জপ করিয়া এত বড় সাধু হইয়াছেন ; শ্রীরামচন্দ্র ইহঁাদের পিতা, শ্রীজানকী ইহঁাদের মাতা এবং ইহঁাদের পিতামাতা খাইতে দেন।” মাতার এই বাক্যে বালকের মনে শ্রীরামচন্দ্র চরণে শরণাগতির যে দৃঢ় সঙ্কল্প জাগরিত হইল মাতা তাহা তখন জানিতে পারিলেন না। কোন এক সময় জনতার ভীড়ে বালক মাতার হস্ত ছাড়িয়া জনতার মধ্যে মিলাইয়া গেল। অনেক অনুসন্ধানেও বালকের কোন সন্ধান না পাইয়া ক্রন্দনরতা জননী স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন করিলেন। প্রায় দুই তিন বৎসর পরে বালকের এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সন্ধান পাইয়া বালককে বাটীতে লইয়া যাইলেন। যথাকালে নবম বৎসর বয়ঃক্রম কালে বালকের উপনয়ন হইল কিন্তু বালক সর্ব্ব বিষয়ে উদাসীন ভাবে দিন যাপন করিতে লাগিল। ঐশী নির্দ্দেশে দ্বাদশ বৎসর বয়ঃক্রমকালে বালকের জন্মভূমি সমীপস্থ এক গ্রামে অকস্মাৎ এক বিদ্যাবয়ীবৃদ্ধ ভ্রমণশীল ঋষিকল্প শ্রীশ্রীঅনন্তশ্রী বিভূষিত শ্রীস্বামী সীতারাম দাসজী মহারাজ নামে এক সন্ত আগমন করিলেন। প্রভুর মঙ্গলময়ী প্রেরণা ও বিবেকাতীশর নিমিত্ত এই দ্বাদশবর্ষ বয়ঃক্রম কালে দুর্জ্জয় গৃহ শৃঙ্খল ছিন্ন করত বালক এই মহাত্মার সহিত মিলিত হইল। কিছুক্ষণের মধ্যে

পৃষ্ঠা ৩০

মহাত্মার সঙ্গ ও উপদেশে প্রভার্বিত হইয়া সহজাত সংস্কার বশত বালকের মনে তীব্র বৈরাগ্য জাগ্রত হইল ও বালক সেই ক্ষণেই সেই মহাপুরুষকে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য্য আশ্রমে দীক্ষা প্রদান করিয়া অনুগৃহীত করিতে অনেক প্রকারে অনুনয় বিনয় করিতে লাগিল। উক্ত সন্ত ভগবান প্রথমে বহু শাস্ত্রীয় উপদেশ দ্বারা পুনরায় গৃহে প্রত্যাবর্তন পূর্ব্বক ঈশ্বর আরাধনার উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন যে গার্হস্থ আশ্রমই কলিযুগে সরল ও শ্রেষ্ঠ পথ ; পরন্তু যাহার যে বস্তু প্রাপ্তির নিমিত্ত উৎকট বাসনা জাগ্রত হয় সে এই বার্দ্ধ উপদেশে আপন স্থির লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হইবার চিত্ত হৃদয়ে ধারণ করিবে কেন? সুতরাং বালক স্বীয় দৃঢ় সঙ্কল্প হইতে বিচ্যুত না হইয়া পুনঃপুনঃ মহাত্মাকে অনুনয় বিনয় করিতে লাগিল। মহাত্মা স্বীয় বিমল বিবেক ধুর বিষদ শ্রুতি অনুকুল তর্ক বিচার দ্বারা বালককে নিরস্ত করিতে ত্রুটি করিলেন না। কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বালক মহাত্মাকে বলিল “আপনি শরণাগতজনকে কৃপা করিয়া শিষ্যত্বে গ্রহণ করুন ; আমাকে এই মোহময় সংসারে প্রেরণ করিবেন না।” বালকের আকুল প্রার্থনায় বিবশ হইয়া মহাত্মা বালককে সঙ্গে লইয়া প্রস্থান করিলেন। এই শুভ সংযোগ মুঙ্গের জিলার জনপদে সংঘটিত হইয়াছিল। পদব্রজে ভ্রমণ করিতে করিতে মহাত্মা বালককে কিছুকাল আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও কর্ম্মকাণ্ডের আচারাদির উপদেশ প্রদান পূর্ব্বক বালকের আচার আচরণ আরও অধিক বিশুদ্ধ করিতে প্রয়াস করিতে লাগিলেন। কখন কখন বালকের মনে কোনরূপ সংসার বাসনা আছে কিনা পরীক্ষা করিতে লাগিলেন যাহাতে বালককে স্বগৃহে ফিরাইয়া দিতে সক্ষম হন। পরন্তু বিশুদ্ধ স্বর্ণ কষ্টি প্রস্তরে পরীক্ষা করিলে কখনও তাহার অশুদ্ধতা নয়নগোচর হয় না। বালকের শুদ্ধ, ঋজু ও গম্ভীর মনোযোগ দেখিয়া মহাত্মা শালীগ্রামীর গঙ্গার তীরে এক উচ্চকোটি সন্তের আশ্রমে আগমন করিলেন এবং এই আশ্রম পরম পবিত্র ও শুভ স্থান জানিয়া অগ্রহায়ণ মাসে, শুক্ল পক্ষে, সপ্তমী তিথির শুভ মুহূর্ত্তে বৈদিক বিধি অনুসারে পঞ্চ সংস্কার অর্থাৎ ললাটে উর্দ্ধপুণ্ড্রতিলক, গলে তুলসীর মালা, বাহুদ্বয়ে ধনু, বাণ, শঙ্খচক্রাদির চিহ্ন, কর্ণে শ্রীরামধনকীর যুগল মন্ত্র এবং শ্রীভাগবত সম্বন্ধীয় নাম করণ দ্বারা বালককে বৈরাগ্য আশ্রমে দীক্ষিত করত উহার নাম শ্রীবাসুদেব দাস রাখিলেন। শাস্ত্রে পঞ্চ সংস্কার নিম্নলিখিত শ্লোকে বর্ণিত হইয়াছে :—

পুণ্ড্রং মুদ্রা তথা নাম মালা মন্ত্রশ্চ পঞ্চমঃ ।

অমী হি পঞ্চ সংস্কারাঃ পুণ্যৈকান্ত হেতবঃ ॥

এই প্রকারে নামকরণ করিয়া শ্রীরামানন্দীয় দীক্ষা তথা বৈষ্ণবী শিক্ষা প্রদান করিলেন। বালক এই বাল্যবয়সেই দিব্যবেশ ধারণ করত দেবতুল্য সুশোভিত

পৃষ্ঠা ৩১

হইতে লাগিলেন। তাঁহার গুরুদেব শিক্ষা প্রদানকালে উপদেশ প্রদান করিলেন “অদ্য হইতে শ্রীরামজানকী তোমার পিতামাতা, পিতৃব্যগণ তোমার বন্ধুবর্গ, তুমি এইক্ষণ হইতে সূর্য্য বংশের—অযোধ্যা তোমার জন্মভূমি ; তুমি অচ্যুত গোত্রে গোত্রান্তরিত হইয়াছ এবং তোমার সকল সম্বন্ধই একমাত্র শ্রীরামজীর সহিত, অন্য কাহারো সহিত নহে জানিও।”

এই বালকই উত্তর কালে আমাদের পরম পূজ্য গুরুদেব শ্রীশ্রীঅনন্ত শ্রীবিভূষিত স্বামী বাসুদেবদাসজী ত্যাগী মহারাজ।

শ্রীমহারাজজী দ্বাদশবর্ষে স্বীয় গুরুদেবের উপরোক্ত উপদেশ এরূপ হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন যে কখনও তাঁহার মুখারবিন্দ হইতে তাঁহার বৈরাগ্য আশ্রমের পূর্ব্বের সংসার আশ্রম সম্বন্ধীয় কোনও বাক্যও শ্রুতিগোচর হয় নাই। যদি কোন সাধু তাঁহার সম্মুখে স্বীয় জন্মভূমির আলোচনা করিতেন, শ্রীমহারাজজী তাঁহাকে বলিতেন “এখনও আপনার পরাবৈরাগ্য পূর্ণরূপে হয় নাই ; কিছু ভেদ রহিয়াছে।”

বালক শিষ্যের সারস্বত শিক্ষার নিমিত্ত শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজের প্রখর দৃষ্টি ছিল। তিনি স্বয়ং বালককে অধ্যাপনা করিতে লাগিলেন এবং এই বিষয়ে তাঁহার অতি কঠোরতা দেখা যাইত। সন্ধ্যার পরে যাহাতে বালক নিদ্রিত হইয়া না পড়ে তজ্জন্য বালকের মস্তকের জটা আম্রবৃক্ষের শাখায় বাঁধিয়া দিতেন। এইরূপ কঠোরতার সহিত বালক শিষ্যের সারস্বত শিক্ষা চলিতে থাকিল। এইরূপে প্রায় পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে বালক শিষ্যের আত্যন্তিক নিষ্ঠা, তিতিক্ষা, বৈরাগ্য, গুরুভক্তিতে বাহ্যিক কঠোর স্বামী সীতারামদাসজী তাঁহার প্রতি অতিশয় স্নেহবশত বিচার করিলেন যে পুরপ্রতীম শিষ্য অত্যন্ত প্রতিভাশালী এবং ভবিষ্যতে ইহাকে লোক কল্যাণ নিমিত্ত আবির্ভূত হইতে হইবে। ইহার শাস্ত্রোক্ত অষ্টাঙ্গযোগ, হঠযোগ, রাজযোগ এবং ইহার সহিত সাম্প্রদায়িক সন্তগণের আচার নিয়ম ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের শিক্ষা আবশ্যক। সুতরাং ইহাকে কিছুকাল শ্রেষ্ঠ সন্তগণের সান্নিধ্যে রাখা একান্ত কৰ্ত্তব্য যাহাতে বালকের উপর ভারতের সন্তগণের প্রভাব পতিত হয় এবং বালক সকল যোগশাস্ত্রে পারঙ্গম হইয়া উত্তরকালে লোকগুরু রূপে আত্মপ্রকাশ করে। শ্রীসীতারামদাসজী মহারাজ স্বয়ং এক উচ্চকোটি সন্ত ছিলেন এবং তিনি সন্ত প্রভাব মানবের জীবনে কিরূপ সুদূর প্রসারী, দিব্য ও অলৌকিক হয় বিলক্ষণ জানিতেন। ভক্তমালের অমর স্রষ্টা শ্রীনাভাজী মহারাজের গুরুদেব শ্রীস্বামী অগ্রদেবদাসজী নাভাজীকে বৈষ্ণবীয় পঞ্চসংস্কার দীক্ষা প্রদান করিয়া সন্ত প্রসাদ গ্রহণ ও সন্ত সেবার নিমিত্ত সন্তগণের সান্নিধ্যে রাখিয়াছিলেন। এই সন্ত প্রভাব ও প্রসাদে শ্রীনাভাজীর অচিরাৎ দিব্য নয়ন প্রস্ফুটিত হইয়াছিল। যথা ভক্তমালে :—

পৃষ্ঠা ৩২

অচরজ দয়ো নয়ো যহা লৌ প্রবেশ ভয়ো,

মন সুখ ছয়ো, জান্যো সন্তন প্রভাব কো ।

আজ্ঞা তব দই ”য়হ ভই তোপৈ সাধু কৃপা,

উহীকো রূপ গুণ কহৌ হিয়ে ভাব কো ॥

বল্যো করজোরি, যাকো পাবত ন ওর ছোর,

গাউঁ রামকৃষ্ণ নহী পাউঁ ভক্তি দাব কো ।

কহীসমুঝাই, বোঝি হৃদয় আই কহে সব,

জিন লৈ দিখাই দঈ সাগর মে নাব কো ॥

কোনও এক সময়ে শ্রীগুরু অগ্রদেবদাসজী ধ্যানমগ্ন হইয়া শ্রীরামচন্দ্রের মানসী সেবা সংলগ্ন ছিলেন এবং শিষ্য নাভাজী অতি সতর্কতার সহিত ময়ূর ভঞ্জন দ্বারা ব্যজন করিতেছিলেন। সেই সময়ে শ্রীঅগ্রদেবদাসজীর এক বণিক শিষ্য প্রান্তর লইয়া জাহাজ যোগে বাণিজ্য নিমিত্ত সমুদ্র যাত্রায় গমন করিলে জাহাজ সঙ্কটে পতিত হইয়াছিল। এই সঙ্কটে জাহাজ সহিত উক্ত বণিক স্বীয় গুরু মহারাজকে স্মরণ পূর্ব্বক প্রার্থনা করিতে লাগিলেন। ইহাতে শ্রীমৎকেবলীর ধ্যান শ্রীভগবানের মনোরম মানসী সেবা হইতে বিচ্যুত হইলে শ্রীনাভাজী শ্রীগুরু মহারাজের ধ্যান বিঘ্ন হৃদরঙ্গম করিয়া হস্তস্থিত ব্যজন দ্বারা জাহাজকে সঙ্কট হইতে রক্ষা করিয়া শ্রীগুরু অগ্রদেবদাসজীকে বিশদ ভাবে নিবেদন করিলেন—“প্রভু! জাহাজ নিরাপদে বহু দূর চলিয়া গিয়াছে আপনি পরম মাধুর্য্যময় প্রভুর ধ্যানে নিমগ্ন হউন।” ইহা শ্রবণ করিয়া শ্রীঅগ্রদেবদাসজী নয়ন উন্মীলন পূর্ব্বক শ্রীনাভাজীর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া বলিলেন—“এরূপ বাক্য কে বলিল?” শ্রীনাভাজী করজোড়ে বলিলেন—“প্রভো, যাহাকে আপনি শিশুকাল হইতে আপনার ভক্ত প্রসাদ দ্বারা পালন করিয়াছেন সেই আপনার কিঙ্কর এই প্রকার নিবেদন করিয়াছে।” শ্রীনাভাজীর অলৌকিক বাক্য শ্রবণে শ্রীঅগ্রদেবদাসজী মহামহোপাধ্যায়ান্বিত হইয়া মনে বিচার করিতে লাগিলেন যে শিষ্য নাভা আমার হৃদয়ে মানসী সেবা কি প্রকারে দর্শন করিতে সক্ষম হইল এবং কি প্রকার এই স্থানে অবস্থান করিয়া জাহাজ সঙ্কট হইতে রক্ষা করিল। ইহা বিচার করিয়া তাঁহার মনে অত্যন্ত প্রসন্নতার উদয় হইল ; তিনি জানিতে পারিলেন যে ইহা সন্তগণের সেবা ও তাঁহাদের প্রসাদের প্রভাবে হইয়াছে এবং তাহাদের প্রসাদ প্রসঙ্গেরই শিষ্য নাভার দিব্য দৃষ্টি হইয়াছে। তখন অগ্রদেবদাসজী নাভাজীকে বলিলেন—“তোমার উপর সন্তগণের কৃপা হইয়াছে অতএব তুমি সেই সাধু সন্তগণের গুণ, স্বরূপ ও হৃদয়ের ভাব বর্ণনা কর।” শ্রীগুরু মহারাজের এই আজ্ঞা শ্রবণ করিয়া শ্রীনাভাজী করজোড়ে বলিলেন—“ভগবন্! আমি শ্রীরাম ও শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণের চরিত কিছু বর্ণনা

পৃষ্ঠা ৩৩

করিতে সমর্থ পরন্তু সন্তগণের চরিত্রের কোন আদি অন্ত পাইতেছি না কারণ তাঁহাদের রহস্য অতিশয় গভীর, আমি ভক্তের ভক্তি রহস্য বর্ণনা করিতে অসমর্থ।” ইহা শ্রবণ করিয়া শ্রীঅগ্রদেবদাসজী বলিলেন—“যাঁহাদের কৃপাপ্রভাবে তুমি আমার মানসীসেবা দর্শন করিয়াছ ও এই স্থানে অবস্থান করিয়াও সাগরে জাহাজ রক্ষা করিয়াছ সেই ভক্ত সন্তগণই তোমার হৃদয়ে অবস্থান করিয়া সকল রহস্য ও তাঁহাদের স্বরূপ প্রদর্শন করাইবেন।” যথা : “সতো দিশান্তি চক্ষুষি”। শ্রীস্বামী সীতারামদাসজী মহারাজ শ্রীস্বামী অগ্রদেবদাসজী মহারাজ সদৃশ প্রিয় পুত্রপ্রতীম শিষ্য কিশোর শ্রীবাসুদেবদাসজীকে ভক্ত সন্তগণের সান্নিধ্যে রাখিতে মনস্থ করিলেন।

 

Comments

Popular posts from this blog

প্রাক কথন - অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - 3)

অনন্ত শ্রীবিভূষিত আচার্যপাদ শ্রীশ্রী স্বামী বাসুদেব দাসজী ত্যাগী মহারাজ প্রসঙ্গ (পর্ব - ১)